আজ তিনি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। ‘কেজিএফ’ সিরিজ তাকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি, আর ‘টক্সিক’ ও ‘রামায়ণ’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা। তবে এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প।

কর্ণাটকের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া যশের শৈশব কেটেছে সীমিত আয়ের সংসারে। তার বাবা ছিলেন সরকারি বাসচালক। একসময় পরিবারের প্রধান উপার্জন ছিল বাবার স্বল্প আয়, যা দিয়েই চলত পুরো সংসার। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ছিল যশের গভীর আগ্রহ।

পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণে একদিন মাত্র ৩০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ছাড়েন তিনি। গন্তব্য ছিল বেঙ্গালুরু। সেখানে না ছিল পরিচিত কেউ, না ছিল নিশ্চিত কোনো কাজের সুযোগ। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে অনেক রাত তাকে ফুটপাতেও কাটাতে হয়েছে।

এক সাক্ষাৎকারে যশ জানিয়েছিলেন, রাস্তায় ঘুমানোর সময় মাঝরাতে পুলিশের তাড়ায় ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয় নিয়ে দিন পার করেছেন। ঠিক এমনই এক রাতে তিনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন সফল অভিনেতা হবেন এবং আর কখনো সেই পরিস্থিতিতে ফিরবেন না।

স্বপ্নপূরণের পথটি ছিল দীর্ঘ। থিয়েটারে অভিনয়, ছোট ছোট চরিত্র এবং টেলিভিশন ধারাবাহিকের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। পরে কন্নড় চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও সারা ভারত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান ‘কেজিএফ’ সিরিজের রকি ভাই চরিত্রের মাধ্যমে।

‘কেজিএফ’ শুধু বক্স অফিসে সাফল্য পায়নি, কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পকেও বৈশ্বিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন যশ।

তারকা খ্যাতি পাওয়ার পরও পরিবারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে যশের বাবা দীর্ঘদিন বাসচালকের চাকরি চালিয়ে গেছেন। ছেলে যখন দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও সফল অভিনেতা, তখনও অবসরের আগ পর্যন্ত নিজের পেশা ছাড়েননি তিনি। যশ একাধিকবার বলেছেন, বাবার আত্মসম্মানবোধ ও কর্মনিষ্ঠা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

বর্তমানে যশের সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। তার অভিনীত ‘টক্সিক’ সিনেমা নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে। পাশাপাশি তিনি ‘রামায়ণ’ প্রকল্পের সঙ্গে অভিনেতা ও প্রযোজক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পর্বে নির্মিত এই প্রকল্পের সম্ভাব্য বাজেট প্রায় চার হাজার কোটি রুপি, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল নির্মাণ হতে পারে।

যদিও নিজের সংগ্রামের গল্প নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন না যশ। গণমাধ্যমে দেওয়া সীমিত সাক্ষাৎকারগুলোতেও তিনি বারবার বলেছেন, তার কাজই তার পরিচয় বহন করবে।

বর্তমানে যশের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৩ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাসিক আয় প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টাকা। প্রতি সিনেমার জন্য তিনি ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন। বেঙ্গালুরুর অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাসভবনে বসবাস করেন তিনি। তার গাড়ির সংগ্রহে রয়েছে মার্সিডিজ-বেঞ্জ, অডি ও বিএমডব্লিউর মতো ব্র্যান্ড।

অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় যশ। নিজস্ব একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন তিনি। স্ত্রী রাধিকা পণ্ডিত, সন্তান আইরা ও আয়ুশ এবং বাবা-মাকে নিয়ে তার পারিবারিক জীবনও বেশ সুখের।

ফুটপাত থেকে আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে, স্বপ্ন যদি যথেষ্ট বড় হয়, তবে সীমিত সামর্থ্যও সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।