কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের এক জীর্ণ টিনের ঘর। এল আকৃতির দুটি কক্ষের একটিতে দুই ভাইকে নিয়ে থাকেন তাইজুল ইসলাম (৩০), যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে পরিচিত। অন্য কক্ষে থাকেন তাঁর শ্রবণপ্রতিবন্ধী মা-বাবা ও বোনেরা। টিনের চালে ছিদ্র, বেড়া ক্ষয়ে গেছে সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরে পানি পড়ে একাকার হয়। স্বাধীনতা দিবসে জিলাপির দাম নিয়ে করা একটি সরল ভিডিও তাইজুলকে রাতারাতি লাখো মানুষের নজরে আনলেও, এই খ্যাতি তাঁর জীবনে স্বস্তির বদলে নিয়ে এসেছে চরম অস্বস্তি।

ফেসবুক পেজ উধাও ও অনুসারীদের উদ্বেগ: এদিকে রোববার দুপুরের পর থেকে তাইজুলের জনপ্রিয় ফেসবুক পেজটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। পেজটি ফেসবুকে অনুপস্থিত দেখে অনুসারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে পেজটি বন্ধ করে দিয়েছে, তবে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।

ভিড়ের চাপে অতিষ্ঠ পারিবারিক জীবন: ভাইরাল হওয়ার পর থেকে তাইজুলের বাড়িটি যেন এক ‘অস্থায়ী স্টুডিও’তে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং উৎসুক মানুষের ভিড়ে অতিষ্ঠ বাড়ির বাসিন্দারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভিড় এড়াতে তাইজুলকে বাড়ি ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়েছে। তাইজুলের ছোট বোন সুফিয়া খাতুন, যার সামনে এসএসসি পরীক্ষা, আক্ষেপ করে বলে- “ভাই ভাইরাল হইছে ভালো লাগছে, কিন্তু এই ভিড়ে আমি পড়তে পারছি না। সবাই ভিডিও করে নিয়ে যায়, কিন্তু আমাদের পেটে কী জুটল বা আমাদের সমস্যা কী, সেটা কেউ দেখে না।”

সহজ-সরল তাজু বনাম সাজানো কনটেন্ট: ঢাকায় রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করা তাইজুল এখন এক অদ্ভুত সংকটে। চরের মানুষের অভাব-অনটন আর সহজ-সরল জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি পরিচিতি পেলেও, এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা তাঁকে দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা জটিল সব বিষয়ে জোর করে ভিডিও বানাচ্ছেন। এতে তাঁর সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে যাচ্ছে। মুঠোফোনে ক্লান্ত কণ্ঠে তাইজুল বলেন, “আমি তো রাজমিস্ত্রির হেলপার ছিলাম। জিলাপির ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পর থেকে অনেক লোক আসছে, অনেকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বিব্রত করছে। তাই একটু দূরে আছি।”

সরকারি সহায়তার আশ্বাস: তবে এই অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাইজুলকে কিছু জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাসজমি, কৃষিজমি এবং নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘোচাতে পারে। স্থানীয় ইউপি সদস্য কবিরুল ইসলাম জানান, তাঁরা চান তাইজুল নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে চরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরুক, বাজেরি কনটেন্টের সস্তা জনপ্রিয়তায় যেন সে হারিয়ে না যায়।