ঢাকাই চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ ও চিত্রনায়িকা শাবনূরের জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয়। পর্দায় তাঁদের রসায়ন যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি সালমানের মৃত্যুর পর দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। একসময় সালমান ও শাবনূরের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলেও গুঞ্জন ছড়ায়। তবে শাবনূর বরাবরই এমন দাবি অস্বীকার করে এসেছেন। তাঁর ভাষ্য, সালমানকে তিনি ভাইয়ের মতোই দেখতেন। এবার একই কথা জানালেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীও।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলে আসছে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাবনূর জানিয়েছেন, সালমান তাঁকে ছোট বোনের মতো দেখতেন। সালমানের নিজের কোনো বোন না থাকায় তাঁকে ‘পিচ্চি’ বলে ডাকতেন বলেও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। এমনকি সালমানের মা-বাবার সঙ্গেও তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি।
সম্প্রতি সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। ডনের গ্রেপ্তার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছেলে সালমানের সঙ্গে শাবনূরের সম্পর্কের প্রসঙ্গও সামনে আনেন নীলা চৌধুরী। তাঁর দাবি, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। বরং সালমান তাঁকে বোনের মতো স্নেহ করতেন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন।
নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, সালমানের কোনো বোন ছিল না। তাই শাবনূরকে তিনি বোনের মতোই দেখতেন এবং তাঁর প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। তবে একই সঙ্গে শাবনূরকে নিয়ে কিছু অভিযোগও করেছেন সালমানের মা। তাঁর দাবি, শাবনূর এমন একটি ধারণা তৈরি করতে চাইতেন যে সালমানের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই সম্পর্কের বিষয়টিই নানা রং মেখে প্রেমের গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে।
তবে শাবনূরের বক্তব্য বরাবরই ভিন্ন। তিনি একাধিকবার স্পষ্ট করে বলেছেন, সালমানকে কখনো প্রেমিক হিসেবে দেখেননি। বরং ভাই হিসেবেই তাঁকে সম্মান করতেন। তাঁর দাবি, সালমানের মৃত্যুর পর কিছু মানুষ তাঁদের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। এমনকি কিছু গণমাধ্যমেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে মুখরোচক নানা গল্প প্রকাশিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় সালমান শাহর। প্রথম সিনেমায় তাঁর নায়িকা ছিলেন মৌসুমী। এরপর ‘তুমি আমার’ সিনেমায় শাবনূরের সঙ্গে প্রথমবার জুটি বাঁধেন তিনি। সেই সিনেমার পর থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রে তুমুল জনপ্রিয়তা পায় সালমান-শাবনূর জুটি।
মাত্র চার বছরের অভিনয়জীবনে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ। এর মধ্যে ১৪টি সিনেমায় তাঁর নায়িকা ছিলেন শাবনূর। ‘তুমি আমার’ দিয়ে শুরু হওয়া এই জুটি পরবর্তী সময়ে অভিনয় করেন ‘সুজন সখী’, ‘বিচার হবে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’সহ একাধিক সিনেমায়। তাঁদের অধিকাংশ সিনেমাই ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়।
পর্দার বাইরে তাঁদের বন্ধুত্বের কথাও জানিয়েছেন শাবনূর। তাঁর মতে, একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই সালমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। শাবনূরের ভাষায়, সালমান ছিলেন বড় মনের মানুষ, বিনয়ী ও আন্তরিক। বয়সে বড়দের সম্মান করতেন, সহশিল্পীদের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করতেন। কাজের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। দুজনের মধ্যে এমন বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল যে অনেক সময় একে অন্যের চোখের ইশারাও বুঝতে পারতেন।
শুধু সালমানের সঙ্গে নয়, তাঁর স্ত্রী সামিরার সঙ্গেও শাবনূরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল বলে জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। শুটিংয়ের সময় সামিরা প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে থাকতেন। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া ও আড্ডার মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের মধ্যেও সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলে জানান শাবনূর।
সালমানের সঙ্গে কাজের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শাবনূর আরও জানিয়েছেন, শুটিংয়ের ফাঁকে তাঁরা প্রায়ই আনন্দ-আড্ডায় মেতে থাকতেন। কক্সবাজারে শুটিংয়ের সময় রাতে সাগরপাড়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজনও করা হতো। সেখানে দুই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সহশিল্পী ও পরিচালকও উপস্থিত থাকতেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মারা যান সালমান শাহ। তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তাঁকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। তাঁর মৃত্যু, ব্যক্তিজীবন ও সহশিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর কথিত প্রেমের সম্পর্কও বারবার আলোচনায় এসেছে। তবে শাবনূরের পর এবার সালমানের মা নীলা চৌধুরীর বক্তব্যেও উঠে এল একই দাবি, সালমান ও শাবনূরের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।