চলচ্চিত্রে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন আশরাফুল হক, যিনি দর্শকের কাছে ডন নামেই বেশি পরিচিত। পর্দায় খলচরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তব জীবনে সালমানের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। শুটিং শেষ করে প্রায় প্রতি রাতেই দুই বন্ধু গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন লং ড্রাইভে। কখনো গুলশানে মিল্কশেক খেতে যেতেন, আবার কখনো উত্তরার ফুটপাতের চিতই পিঠার দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। গন্তব্যহীন সেই রাতগুলোর নানা স্মৃতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ডন।

তিন দশক পর সেই ডনই এখন সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। গত রোববার দুপুরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। ডনের গ্রেপ্তারের পর নতুন করে সামনে এসেছে সালমানকে ঘিরে তাঁর বলা পুরোনো স্মৃতি ও দুই বন্ধুর সম্পর্কের নানা গল্প।

সালমান শাহর সঙ্গে বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ডন। তবে তাঁদের সম্পর্ক শুধু শুটিং সেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কাজের বাইরে নিয়মিত আড্ডা ও ঘোরাঘুরি করতেন তাঁরা। ডনের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন গাড়ি চালাতে। দিনের কাজ শেষ হলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন দুই বন্ধু। বেশির ভাগ সময় তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকত না। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা।

গাড়ি চালানোর সময় সালমানের গতি কিছুটা বেশি থাকত বলেও জানিয়েছিলেন ডন। লং ড্রাইভের একপর্যায়ে প্রায়ই তাঁরা চলে যেতেন গুলশানের একটি সাধারণ রেস্তোরাঁয়। সেখানকার মিল্কশেক ছিল সালমানের বিশেষ পছন্দের। ডনের স্মৃতিতে, এমনও হয়েছে যে শুধু সালমানের জন্য রাতে দোকান খোলা রেখেছেন দোকানদার। মিল্কশেক খেয়ে ও কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন তাঁরা।

উত্তরার একটি ফুটপাতের চিতই পিঠার দোকানও ছিল দুই বন্ধুর পছন্দের জায়গা। সেখানে এক বয়স্ক নারী পিঠা বানাতেন। সালমান তাঁকে স্নেহ করে ‘নানি’ বলে ডাকতেন। একসঙ্গে বসে দুজনই বেশ কয়েকটি করে চিতই পিঠা খেতেন। ডনের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে, কখনো আটটি পিঠা খেয়েও সালমান ৫০০ টাকা দিয়ে দিতেন। সে সময়ের হিসাবে যা ছিল বেশ বড় অঙ্ক।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের অভিনয়জীবনে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামে দর্শকের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহকে ঘিরে আলোচনা, স্মৃতিচারণা ও নানা প্রশ্নের শেষ হয়নি।

এদিকে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ডনকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে ডনসহ অন্য আসামি ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে। ডন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন উল্লেখ করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।

আদালত সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে ডনকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। এ সময় তাঁকে কিছুটা রাগান্বিত দেখা যায়। প্রায় পাঁচ মিনিট পর বিচারক এজলাসে এসে আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত আছেন কি না, তা জানতে চান। তবে শুনানির সময় ডনের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

একসময় যে মানুষটি সালমান শাহর সঙ্গে রাতের ঢাকার পথে গন্তব্যহীন লং ড্রাইভে বের হতেন, সেই আশরাফুল হক ডনের বর্তমান অবস্থান তাই পুরোনো সেই বন্ধুত্বের স্মৃতিকে আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।