একসময় সিনেমার পারিশ্রমিক দিয়ে জীবন চালানো সম্ভব হবে, এমনটা ভাবতেও পারেননি অভিনেত্রী তুষি। অথচ এখন সেই অভিনয়ই তাঁর জীবিকা, পরিচিতি ও আত্মবিশ্বাসের বড় উৎস। ‘হাওয়া’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রইদ’-এর মতো সিনেমায় কাজ করে ধীরে ধীরে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন তিনি। একটা সময় অনেকে বলেছিলেন, ‘হাওয়া’র পর তুষি নাকি হারিয়ে গেছেন, তাঁর হাতে কাজ নেই। তবে সেসব কথার জবাব দিয়েছেন নীরবে কাজ করে। একের পর এক নতুন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের পথ তৈরি করেছেন এই অভিনেত্রী।

‘বছরটা বেশি বেশি হয়ে গেল’

বছরের শুরুতে রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হয় তুষির সিনেমা ‘রইদ’। এরপর দুই ঈদে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রইদ’। পাশাপাশি আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘অ্যানি’ জার্মানির একটি উৎসব থেকে সুখবর নিয়ে আসে। অন্যদিকে রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’ সিনেমার প্রচারণা নিয়েও আলোচনায় ছিলেন তিনি।

এতগুলো কাজ কাছাকাছি সময়ে সামনে আসায় নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে ভাবছেন তুষি। তাঁর ভাষ্য, তিনি সব সময় কাজের মধ্যেই ছিলেন, যদিও বাইরে থেকে অনেকের কাছে তা দৃশ্যমান হয়নি। এ বছর একসঙ্গে এত কাজ মুক্তি পাবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি। সবকিছু পাশাপাশি সময়ে চলে আসায় তাঁর মনে হচ্ছে, বছরটা যেন একটু বেশিই রঙিন হয়ে উঠেছে। এই সময় যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়, এমনটাই চান অভিনেত্রী। কারণ, অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে আরও নানা রূপে আবিষ্কার করতে চান তিনি।

পথচলা এখনো বাকি

কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মিডিয়ায় আসেননি তুষি। নিজের মতো করে পথ চলেছেন এবং ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়েও খুব বেশি হিসাব করেন না। তবে ভালো সময়ে ভালো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে চান তিনি।

গত কয়েক বছরে নিজেকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছেন তুষি। সাফল্য এলেও তাঁর মনে হয়, অভিনয়ের পথে এখনো অনেকটা এগোনো বাকি। আরও নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে চান তিনি। পছন্দের চরিত্রগুলো যেন এই সুসময়ের মধ্যেই পান, সেই প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর।

তবে দেশের সিনেমায় নারীকেন্দ্রিক গল্পের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভাবনা রয়েছে অভিনেত্রীর। তাঁর মতে, বেশির ভাগ সিনেমার গল্প এখনো পুরুষকেন্দ্রিক। সময়ের সঙ্গে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং নারীকেন্দ্রিক চরিত্রের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করেন তিনি। একই সঙ্গে নারী অভিনয়শিল্পীদেরও নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তুষি।

এবার নতুন রূপে পর্দায় আসছেন তুষি

তুষিকে নিয়ে দর্শকের নানা প্রশ্ন রয়েছে। তিনি কেন নাচেন না, কেন মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করেন না, কিংবা একই ধরনের চরিত্রে আর কত দিন দেখা যাবে তাঁকে, এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে এই অভিনেত্রীকে। এবার কাজের মাধ্যমেই এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান তিনি।

তুষি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এমন চরিত্রের অপেক্ষায় ছিলেন, যা তাঁকে নিজের পরিচিত অভিনয়ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেবে। এবার পছন্দমতো চিত্রনাট্যে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। তাই নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় আটকে রাখতে চান না।

প্রথমবারের মতো মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করতে যাচ্ছেন তুষি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিনেমাটিতে নাচ, গান ও মারপিটের মতো উপাদানও থাকতে পারে। তবে এখনই প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত বলতে চান না তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেতে পারে সিনেমাটি।

তুষি বলেন, রোমান্টিক প্রেমের গল্পে খুব বেশি কাজ করা হয়নি তাঁর। থ্রিলার ও হররের মতো жанরেও আরও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। এবার নিজের অভিনয়ের পরিচিত গণ্ডি ভাঙার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বিশ্বজুড়ে সিনেমার গল্প বলার ধরন ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আসছে উল্লেখ করে তুষি জানান, আগামী বছর দর্শক তাঁকে ভিন্নভাবে দেখতে পাবেন।

‘আন্ধার’ পিছিয়ে যাওয়ায় মন খারাপ নেই

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়েই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল রায়হান রাফী পরিচালিত ‘আন্ধার’। তবে সিনেমাটি পিছিয়ে আগামী বছরের ২৬ মার্চ মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমাটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে মুক্তি পেয়েছে। প্রেক্ষাগৃহের পর ওটিটিতেও দর্শকের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তুষি।

‘আন্ধার’-এর মুক্তি পিছিয়ে যাওয়ায় মন খারাপ হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তুষি জানান, প্রযোজকের সিদ্ধান্তে তিনি খুশি। তাঁর মতে, সিনেমা মুক্তির ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে পোস্টপ্রোডাকশন, প্রচার ও বিপণনের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া প্রয়োজন। মাত্র সাত দিনে একটি সিনেমার পোস্টপ্রোডাকশনের কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তুষির মতে, দর্শকের কাছে সিনেমা পৌঁছে দিতে পরিকল্পিত প্রচারণা জরুরি। প্রযোজকের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি সিনেমা মুক্তির জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

‘আই লাভ ইউ, তুষি আপু’

এখন সিনেমার প্রচারণায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও যেতে হয় তুষিকে। সেখানে কখনো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন, আবার কখনো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণামূলক কথা বলেন।

সম্প্রতি এমনই এক অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থী মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করেই বলে ওঠেন, ‘আই লাভ ইউ, তুষি আপু। আমি আপনার মতো অভিনয়শিল্পী হতে চাই। আমি আপনার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই।’

ঘটনাটি তুষিকে আবেগাপ্লুত করেছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর সমসাময়িক অনেকেই নাটকে অভিনয় করে ভালো করছিলেন। কিন্তু তিনি নাটকের বাইরে অজানা এক পথে, সিনেমায় নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করেছেন। সেই পথে শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও ছিল।

আজ যখন কেউ তাঁকে অনুসরণ করার কথা বলেন, তখন নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আরও আস্থা পান তুষি। তাঁর মতে, এই স্বীকৃতি তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করে এবং মনে করিয়ে দেয়, তিনি সঠিক পথেই এগোচ্ছেন।

পুরস্কার তাঁর কাছে আনন্দের হলেও সেটিই কাজের মূল লক্ষ্য নয়। বরং চরিত্রের মধ্যে নিজেকে আরও গভীরভাবে মেলে ধরতে চান তিনি। এ জন্য আরও পরিশ্রম করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অভিনেত্রী। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দীর্ঘদিন ধরে পাশে থাকা মানুষদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তুষি।