বলিউডের বড় কোনো তারকা নেই, নেই জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা কিংবা বিশাল বাজেট। মুক্তির পর প্রথম দুই সপ্তাহেও বক্স অফিসে সাফল্যের কোনো আভাস ছিল না সিনেমাটির। তবে এরপরই বদলে যায় পুরো চিত্র। দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে বিশাল চতুর্বেদি পরিচালিত আধ্যাত্মিক ড্রামা ‘হনুমান অংশ’। ধীরে ধীরে ‘স্লিপার হিট’ তকমা পাওয়া সিনেমাটি এখন বক্স অফিসে রীতিমতো ঝড় তুলছে।
সিনেমাটির সাফল্য শুধু ট্রেড বিশ্লেষকদেরই চমকে দেয়নি, এর প্রভাব পড়েছে বড় তারকাদের সিনেমার ব্যবসাতেও। প্রেক্ষাগৃহে ‘হনুমান অংশ’-এর দাপটে সদ্য মুক্তি পাওয়া অক্ষয় কুমার ও সাইফ আলী খানের আলোচিত সিনেমা ‘হাইওয়ান’ও কিছুটা চাপে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির ৩৯তম দিনে ভারতে ‘হনুমান অংশ’-এর মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২৬৩ কোটি ৩০ লাখ রুপি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও ১৬ কোটি ৫০ লাখ রুপি গ্রস আয় যোগ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২৭৯ কোটি ৮০ লাখ রুপি।
সিনেমাটির এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া প্রচারণা বা ‘মাউথ পাবলিসিটি’কে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ছবির আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু এবং দর্শকের মনে প্রশ্ন তৈরি করার মতো গল্পই মূলত মানুষকে প্রেক্ষাগৃহে টেনে এনেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিনের এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ‘হনুমান অংশ’ শুধু ঈশ্বরভক্তির গল্প নয়, বরং অহং ও কামনাকে অতিক্রম করে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শান্তি খোঁজার এক জীবনদর্শন তুলে ধরে। নীম করোলি বাবার জীবনের বিভিন্ন শিক্ষা ও দর্শনের মাধ্যমে প্রতিকূলতার মুখে প্রতিহিংসার পরিবর্তে আত্মসমর্পণ এবং নিজের ভেতরের ‘আমি’কে বিলীন করার ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিনেমাটি দর্শকদের নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঈশ্বরকে খোঁজার একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করতে বলে না। বরং প্রশ্ন তোলে, প্রার্থনার সময় মানুষ আসলে কী চায়। নিজের বিশ্বাস, সংশয় ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করায় সিনেমাটি ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিকতা ও ভালোবাসায় বিশ্বাসী দর্শকদেরও আকৃষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
হিন্দুধর্মে হনুমান শক্তি, ভক্তি ও আনুগত্যের প্রতীক। ‘হনুমান অংশ’-এ নীম করোলি বাবার জীবন ও দর্শনের মাধ্যমে নিঃশর্ত ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের ধারণাকে তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটির এই আধ্যাত্মিক আবেদনই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে মনে করছেন সিনেমা সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে সিনেমাটির বাজেটও ছিল তুলনামূলকভাবে খুব কম, প্রায় দুই কোটি রুপি। এত কম বাজেটের মধ্যেও ভিজ্যুয়াল এফেক্টস দর্শকদের ভালো অভিজ্ঞতা দিয়েছে বলে মত সমালোচকদের। পাশাপাশি নীম করোলি মহারাজের চরিত্রে শোভিনব সত্যের অভিনয়ও দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছে।
‘হনুমান অংশ’ তৈরি হয়েছে ভারতের আধ্যাত্মিক সাধক নীম করোলি বাবার জীবনকে কেন্দ্র করে। তাঁর আসল নাম লক্ষ্মণ নারায়ণ শর্মা। তিনি ছিলেন হনুমান বা বজরংবলীর একনিষ্ঠ ভক্ত। ধারণা করা হয়, ১৯০০ সালের দিকে উত্তর প্রদেশের আকবরপুরে এক ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। অনুসারীদের কাছে তিনি ‘মহারাজ জি’ এবং উত্তর ভারতে ‘মিরাকল বাবা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
নীম করোলি বাবাকে ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রেনের ঘটনা। কথিত আছে, টিকিট না থাকায় তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হলে ট্রেন আর চলছিল না। পরে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে ট্রেনে তুলে নেওয়ার পর ট্রেন চলতে শুরু করে। ঘটনাটি নীম করোলি নামের একটি এলাকায় ঘটেছিল বলে পরবর্তীতে তিনি নীম করোলি বাবা নামে পরিচিত হন। তবে এসব ঘটনা মূলত তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত আধ্যাত্মিক কাহিনি হিসেবে বিবেচিত।
ষাট ও সত্তরের দশকে বহু পশ্চিমা নাগরিক তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষায় আকৃষ্ট হন বলে জানা যায়। প্রযুক্তি বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব স্টিভ জবস ও মার্ক জাকারবার্গও উত্তরাখণ্ডের কৈঞ্চী ধাম আশ্রম থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নীম করোলি বাবা মহাসমাধিতে দেহত্যাগ করেন বলে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। তাঁর জীবন, দর্শন ও ভক্তির ধারণাকেই পর্দায় তুলে ধরেছে ‘হনুমান অংশ’, যা মুক্তির কয়েক সপ্তাহ পর এসে বক্স অফিসে বড় চমক তৈরি করেছে।