চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ায় কিছু চরিত্র এমনভাবে দাগ কেটে যায়, যা দশকের পর দশক ধরে দর্শকেরা মনে রাখেন। তেমনি এক জনপ্রিয় কমিকস চরিত্র 'সুপারগার্ল'। কমিকসের পাতায় এই চরিত্রের জন্ম বহু বছর আগে হলেও, বড় পর্দায় এর যাত্রাটা কিন্তু একদমই সহজ বা সুখকর ছিল না। আজ থেকে প্রায় ৪২ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল এই চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রথম একক সিনেমা ‘সুপারগার্ল’। ডিসি ইউনিভার্সের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই নারী সুপারহিরোকে নিয়ে তৈরি সেই স্পিন-অফ ছবিটি বক্স অফিসে চরমভাবে ব্যর্থ হয় এবং সমালোচকদের কাছ থেকেও পায় তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে সিনেমা বিশ্লেষকেরা মনে করতেন, সেই একটি ব্যর্থতার কারণেই হলিউডে নারী সুপারহিরোদের নিয়ে একক সিনেমা নির্মাণের পথ অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে দীর্ঘ চার দশকের সেই খরা কাটিয়ে এবং ইতিহাস বদলানোর প্রত্যয় নিয়ে আবারও বড় পর্দায় ফিরছে এই চরিত্রটি। আজ ২৬ জুন বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পাচ্ছে নতুন রূপের ‘সুপারগার্ল’। একই দিনে বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য সিনেমাটি স্টার সিনেপ্লেক্সেও মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
নতুন ডিসি ইউনিভার্সের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন ক্রেইগ গিলেস্পি। এর আগে ‘আই, টনিয়া’ এবং ‘ক্রুয়েলা’র মতো প্রশংসিত ও আলোচিত সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি হলিউডে নিজের জাত চিনিয়েছেন। এবারের ছবিতে নামভূমিকায়, অর্থাৎ সুপারগার্ল চরিত্রে অভিনয় করেছেন উদীয়মান অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী মিলি অ্যালকক। তাঁর সঙ্গে পর্দায় আরও একঝাঁক তারকাকে দেখা যাবে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাথিয়াস শোনার্টস, ইভ রিডলি, ডেভিড ক্রামহোল্টজ, এমিলি বিচাম, ডেভিড কোরেনসওয়েট এবং জেসন মোমোয়া।
নতুন ডিসি ইউনিভার্সে দর্শকেরা প্রথমবার এই সুপারগার্লকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস গানের ‘সুপারম্যান’ সিনেমায়। তবে সেখানে তাঁর উপস্থিতি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। সেই সামান্য উপস্থিতিই মূলত ডিসি ভক্তদের মনে এক বিশাল কৌতূহল ও আগ্রহের জন্ম দেয়, যার ওপর ভিত্তি করেই এবার পূর্ণাঙ্গ রূপ নিল এই সিনেমা। ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ সিরিজে তরুণ রেনিরা টারগারিয়েন চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া মিলি অ্যালককের কাঁধেই এবার ন্যস্ত হয়েছে নতুন এই গুরুদায়িত্ব। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে ছোট পর্দার দর্শকদের কাছে ‘সুপারগার্ল’ মানেই ছিল মেলিসা বেনয়েস্টের চিরচেনা মুখ, তবে ডিসির নতুন মেগা প্ল্যানে চরিত্রটিকে সম্পূর্ণ নতুন ও আকর্ষণীয়ভাবে বড় পর্দায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর ভিন্নধর্মী গল্প এবং চরিত্র নির্মাণ। আমাদের চেনা সুপারম্যানের মতো পৃথিবীতে কোনো নিরাপদ, শান্ত ও স্নেহময় পরিবেশে বড় হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি কারা জোর-এল বা ‘সুপারগার্ল’-এর। নিজের গ্রহ ক্রিপ্টন ধ্বংস হওয়ার সময় তার একটি বিচ্ছিন্ন অংশে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বড় হতে হয়েছে তাকে। ফলে শৈশবেই নিজের চোখের সামনে চারপাশের মানুষের নির্মম মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হয়েছে তাকে। এই ট্র্যাজিক অতীতেরই প্রভাবে তাঁর ব্যক্তিত্ব সুপারম্যানের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর, ক্ষতবিক্ষত এবং বাস্তববাদী হিসেবে গড়ে উঠেছে। সিনেমায় দেখা যাবে, নিজের বিশ্বস্ত পোষ্য কুকুর ক্রিপ্টোকে সঙ্গে নিয়ে মহাকাশ ভ্রমণে বের হয় কারা। সেই অভিযানের মাঝেই তার পরিচয় হয় রুথি নামের এক কিশোরীর সঙ্গে, যার পুরো পরিবারকে এক ভয়ংকর দস্যু নেতা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এরপরই রুথি ও সুপারগার্ল একে অপরের হাত ধরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও প্রতিশোধের খোঁজে এক বিপজ্জনক আন্তগ্যালাকটিক মিশনে নেমে পড়ে।
ডিসি কমিকসের অত্যন্ত জনপ্রিয় সিরিজ ‘সুপারগার্ল: ওম্যান অব টুমরো’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করা হয়েছে। যার ফলে এটি সাধারণ ও গতানুগতিক সুপারহিরো অ্যাকশন ঘরানার বাইরে গিয়ে অনেক বেশি আবেগঘন এবং মানবিক এক সম্পর্কের গল্প বলবে। এছাড়া ছবিটির ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। সমালোচকদের অনেকেই এর ভিজ্যুয়াল স্টাইলের সাথে ‘ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড’ কিংবা ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’-র মতো কালজয়ী সিনেমার তুলনা করছেন। একই সাথে ছবিতে 'লোবো' চরিত্রে জেসন মোমোয়ার লাইভ-অ্যাকশন ডেবিউ নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। জেমস গান ও পিটার সাফরানের নেতৃত্বে ডিসি স্টুডিওস যেভাবে তাদের পুরো সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সকে নতুন করে সাজাচ্ছে, তাতে ‘সুপারগার্ল’ শুধু একটি একক সিনেমা নয়, বরং ডিসির ভবিষ্যতের এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে।