বাঙালির শেকড় আর উপমহাদেশের সুরের আকাশ—যার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য ইতিহাস, তিনি রাহুল দেব বর্মণ। শ্রোতাদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে আছেন ‘আর ডি বর্মন’ বা আদর করে ডাকা ‘পঞ্চমদা’ নামে। আজ এই কালজয়ী সংগীত কিংবদন্তির জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে প্রিয় মানুষকে স্মরণ করে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন ভারতের আরেক নন্দিত গায়ক কুমার শানু। জানালেন পর্দার আড়ালের এক প্রাণখোলা আর ডি বর্মনকে, যিনি শুধু সুরের জাদুকরই ছিলেন না, বরং চমৎকার রান্না করে মানুষকে খাওয়াতেও ভালোবাসতেন।

একটি স্মৃতিকথায় কুমার শানু লিখেছেন, বাঙালির প্রতি আর ডি বর্মনের ভালোবাসা ছিল অগাধ। শানুর সাথে সবসময় বাংলায় কথা বলতে পছন্দ করতেন এবং দারুণ আনন্দ পেতেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন ভীষণ মনখোলা ও হাসিখুশি। আশপাশের মানুষকে আপ্যায়ন করা এবং নিজে রেঁধে খাওয়ানো ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় অভ্যাস। শানু আবেগপ্লুত হয়ে জানান, আর ডি বর্মনের হাতের রান্না করা খাসির মাংসের (মাটন) স্বাদ আজও তাঁর মুখে লেগে আছে। যে মানুষ এত আদর করে অন্যদের খাওয়াতে পারেন, তাঁর মনটা যে কতটা বড়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্টুডিওতে গেলেই তিনি শানুকে পরম যত্নে আগলে রাখতেন।

মুম্বাইয়ের স্টুডিও পাড়ায় কুমার শানুর শুরুর দিনগুলোর গল্পটাও আর ডি বর্মনের সাথে জড়িয়ে আছে। স্ট্রাগলিং পিরিয়ডে শানু নিজের গানের রেকর্ড নিয়ে বিভিন্ন স্টুডিওতে ঘুরে বেড়াতেন। তেমনই এক দিনে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় আর ডি বর্মনের সাথে। দেখা হতেই শানু তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই তিনি বুঝে যান ছেলেটি বাঙালি। এরপর অত্যন্ত সহজভাবে বাংলায় বললেন, ‘বসো বসো। রেকর্ডিং দেখো বসে।’ সেই প্রথম আলাপের পর থেকে আর ডি বর্মনের যেকোনো গানের রেকর্ডিং থাকলেই শানু স্টুডিওর বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়তেন এবং তাঁর কাজ নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।

আর ডি বর্মনের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি প্রত্যেক শিল্পীর কণ্ঠের ধরন ও শক্তি বুঝে গান তৈরি করতেন। তাঁর সুরেই কুমার শানু গেয়েছিলেন ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’ চলচ্চিত্রের কালজয়ী গান ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা’। এই একটি গান কালের সীমানা পেরিয়ে আজও প্রতিটি সংগীতপ্রেমী মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কুমার শানু জানান, আজও তিনি যেখানেই কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে যান, এই গানটি গেয়ে পরম শ্রদ্ধায় তাঁর প্রিয় ‘পঞ্চমদা’কে স্মরণ করেন।