গোপাল ভাঁড়ের নামের পেছনে কী ইতিহাস?

বাংলার লোককথা ও রসিকতার জগতে সবচেয়ে পরিচিত চরিত্রগুলোর একটি গোপাল ভাঁড়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার রসিক ব্যক্তি হিসেবে তাঁর নানা কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। তবে ‘গোপাল ভাঁড়’ নামটি কীভাবে এল, তাঁর আসল নামই বা কী ছিল, তা নিয়ে ইতিহাস ও গবেষণায় রয়েছে নানা মত।

প্রচলিত একটি মত অনুযায়ী, তাঁর আসল নাম ছিল গোপালচন্দ্র প্রামাণিক। তবে অন্য একটি গবেষণামূলক সূত্রে তাঁর নাম গোপালচন্দ্র নাই বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর প্রকৃত নাম নিয়ে আজও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

তবে ‘ভাঁড়’ শব্দটি তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলো, এ নিয়ে রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য মত। ‘ভাঁড়’ বলতে সাধারণত রাজসভায় রসিকতা, কৌতুক ও গল্পের মাধ্যমে রাজা ও সভাসদদের বিনোদন দিতেন এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হতো। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গোপাল এমন একজন রসিক ও মনোরঞ্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন বলেই লোককথায় তাঁর নামের সঙ্গে ‘ভাঁড়’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়।

আরেকটি মতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ভাণ্ডারী’ শব্দটি। ১৯২৬ সালে নগেন্দ্রনাথ দাসের লেখা নদ্বীপ কাহিনী গ্রন্থে দাবি করা হয়, গোপালচন্দ্র নাই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজভাণ্ডারের দায়িত্বে থাকা একজন ভাণ্ডারী ছিলেন। এই মত অনুযায়ী, ‘ভাণ্ডারী’ শব্দটি পরিবর্তিত বা সংক্ষিপ্ত হয়ে পরবর্তীকালে ‘ভাঁড়’ নামে পরিচিতি পায়।

তবে এই ব্যাখ্যাও সর্বসম্মত নয়। বরং ‘ভাঁড়’ শব্দটি সরাসরি তাঁর পেশাগত পরিচয় থেকেই এসেছে, এমন মতও প্রচলিত। অর্থাৎ রাজসভায় হাস্যরস ও কৌতুকের মাধ্যমে মনোরঞ্জন করতেন বলেই তিনি ‘গোপাল ভাঁড়’ নামে পরিচিত হয়ে থাকতে পারেন।

গোপাল ভাঁড়ের নামের মতো তাঁর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাহিত্যিক ও গবেষক সুকুমার সেনসহ একাংশের মতে, গোপাল ভাঁড় মূলত লোককথার একটি কাল্পনিক চরিত্র। কারণ অষ্টাদশ শতাব্দীর সমসাময়িক সাহিত্য ও নথিতে তাঁর নির্ভরযোগ্য উল্লেখ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে নদীয়া ও কৃষ্ণনগরের স্থানীয় জনশ্রুতি তাঁকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার বাস্তব চরিত্র হিসেবেই তুলে ধরে।

ফলে ইতিহাসের বিচারে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, গোপাল ভাঁড় আসলে কে ছিলেন এবং তাঁর নামের ‘ভাঁড়’ অংশটি ঠিক কোন উৎস থেকে এসেছে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, রাজসভায় তাঁর রসিকতা ও মনোরঞ্জনকারীর ভূমিকার কারণেই ‘ভাঁড়’ পরিচিতিটি তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। আর ‘ভাণ্ডারী’ থেকে ‘ভাঁড়’ নামের উৎপত্তির তত্ত্বটি রয়েছে বিকল্প মত হিসেবে।