মালয়ালম সিনেমার ক্রাইম থ্রিলার মানেই দর্শকদের কাছে বাড়তি প্রত্যাশা। বিশেষ করে পুলিশি তদন্তনির্ভর গল্পে গত এক দশকে দারুণ কিছু সিনেমা উপহার দিয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রি। সেই ধারায় নতুন সংযোজন ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’। প্রেক্ষাগৃহে সাফল্যের পর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনেকেই তুলনা করছেন জনপ্রিয় থ্রিলার ‘দৃশ্যম’-এর সঙ্গে। কারও কারও মতে, নতুন সিনেমাটি সেই জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া জিতু জোসেফ পরিচালিত ‘দৃশ্যম’ পুলিশি তদন্তনির্ভর থ্রিলারের ক্ষেত্রে আলাদা মানদণ্ড তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সিনেমাটির আরও কিস্তি এবং হিন্দি রিমেকও নির্মিত হয়েছে। ফলে একই ঘরানার নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পেলেই তার সঙ্গে ‘দৃশ্যম’-এর তুলনা চলে আসে। তবে ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ পরিচিত এই ধারার মধ্যেও গল্প বলার ভিন্নতা দেখিয়েছে।

‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ নামটির অর্থ প্রথম দৃষ্টিতে অপরাধী। সিনেমার শুরুতে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রের পরিচয় তুলে ধরতে সময় নেয় চিত্রনাট্য। প্রথমদিকে সেই ধীরগতির কারণ স্পষ্ট না হলেও গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, চরিত্রগুলোর দুর্বলতা ও ব্যক্তিগত সংকটই মূল ঘটনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কাহিনির অন্যতম কেন্দ্র আলিনা, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্বতী থিরুভোথু। স্বামীকে হারানোর পর ছোট মেয়েকে নিয়ে জীবন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। নতুন থানায় দায়িত্ব নিতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল দিব্যার সঙ্গে। পাশাপাশি দাসন ও শ্রীনাথের জীবনেও অপেক্ষা করছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

এই পুলিশ কর্মকর্তারা সিনেমার প্রচলিত আদর্শবান নায়কদের মতো নন। তাঁদের দৈনন্দিন জীবন সাধারণ, কর্মক্ষেত্রে রয়েছে দ্বন্দ্ব, আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কও সব সময় স্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি ভুল তাঁদের সবার জীবনকে এমন সংকটে ফেলে দেয়, যার পরিণতি আর সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।

সিনেমাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো নৈতিকতা ও আইনের মধ্যকার সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব। ‘দৃশ্যম’-এর জর্জকুট্টির মতো এখানে কোনো অসাধারণ বুদ্ধিমান পরিকল্পনাকারী নেই, যিনি ঠান্ডা মাথায় প্রতিটি পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। বরং নিজেদের ভুলের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন কয়েকজন সাধারণ পুলিশ সদস্যকে ক্রমেই জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

এই সংকট আরও গভীর হয় অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস মিরানের আগমনে। বিজয়ারাঘবন অভিনীত মিরান দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং সুনামধারী একজন তদন্তকারী। একদিকে ভুল করে বিপাকে পড়া কয়েকজন পুলিশ সদস্য, অন্যদিকে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামা অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। এই দুই পক্ষের সংঘাতই গল্পের উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।

শুরুতে মিরানকে নিয়ম মেনে চলা আদর্শ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, তাঁর সিদ্ধান্ত ও নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ব্যক্তিগত অহং, পদমর্যাদা এবং নিজের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অস্বস্তি তাঁর বিচারবুদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ফলে শুধু অভিযুক্তদের নয়, তদন্তকারীর অবস্থানও দর্শকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

পরিচালক শাহাদের আগের সিনেমা ‘প্রকাশন পারাক্কাট্টে’ তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে নতুন সিনেমায় তাঁর নির্মাণশৈলীতে উন্নতি চোখে পড়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের সিনেমাটিতে কিছু জায়গায় গল্প এগিয়ে নিতে সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হলেও সামগ্রিক উত্তেজনা ধরে রাখতে পেরেছেন নির্মাতা।

চিত্রনাট্যকার পি এস সুব্রামানিয়ান ও বিজেশ থোত্তিঙ্গাল পুলিশি তদন্তের পরিচিত উপাদান ব্যবহার করেও গল্পে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা বজায় রেখেছেন। একটি চরিত্রের লেখা বইকে রহস্য উন্মোচনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদ, থানার ভেতরের উত্তেজনা এবং তদন্তের নানা বাঁকের মধ্যে বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস গল্পের গাম্ভীর্যকে ভারসাম্যপূর্ণ করেছে।

আলিনা চরিত্রে পার্বতী থিরুভোথু সিনেমাটির আবেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছেন। নতুন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর মধ্যে যেমন সতর্কতা ও অনভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার দৃঢ়তাও আছে। এই দুই বৈশিষ্ট্যের ভারসাম্য তাঁর অভিনয়কে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

অন্যদিকে হ্যারিস মিরান চরিত্রে বিজয়ারাঘবন এমন একজন তদন্তকারীকে তুলে ধরেছেন, যাঁর উপস্থিতিই অভিযুক্তদের ওপর চাপ তৈরি করে। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা গল্পের রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে।

মালয়ালম সিনেমায় পুলিশি তদন্তনির্ভর থ্রিলারের সংখ্যা বাড়লেও ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ নৈতিক দ্বন্দ্ব ও চরিত্রের জটিলতার মাধ্যমে আলাদা হয়ে উঠেছে। এখানে প্রায় প্রত্যেক চরিত্রের অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। দর্শক কখনো মনে করতে পারেন, রহস্যের সমাধান বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু গল্প বারবার নতুন মোড় নিয়ে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

‘দৃশ্যম’-এর সঙ্গে তুলনা না করেও সিনেমাটিকে উপভোগ করা সম্ভব। যারা রহস্য, পুলিশি তদন্ত এবং নৈতিকতার জটিল হিসাব-নিকাশ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ‘প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার’ হতে পারে দেখার মতো একটি থ্রিলার।

একনজরে
  • সিনেমা: প্রধমা দৃষ্টিয়া কুট্টাকার

  • ধরন: ক্রাইম থ্রিলার

  • পরিচালক: শাহাদ

  • অভিনয়: পার্বতী থিরুভোথু, বিজয়ারাঘবন, সিদ্ধার্থ ভরতন, ম্যাথু থমাস, বিনয় ফোর্ট ও উন্নিমায়া প্রসাদ

  • স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: নেটফ্লিক্স

  • দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট