আলোচনায় পশ্চিমবঙ্গের গায়িকা ও অভিনেত্রী দেবলীনা নন্দী। চলতি বছরের শুরুতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন দেবলীনা। তখনই প্রবাহ নন্দীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের কথা প্রকাশ্যে আসে। গত সপ্তাহেই তিক্ত দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলেছিলেন প্রবাহ। এবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিলেন দেবলীনা। গতকাল শনিবার দুই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে বারুইপুর আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। কী নিয়ে তাঁদের কলহ? কেনই বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বারবার শিরোনামে গায়িকা? জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
পারফেক্ট কাপল থেকে সম্পর্কে ভাঙন
একসময় দেবলীনা-প্রবাহকে দেখলে মনে হতো, এ যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘পারফেক্ট কাপল’-এর বাস্তব রূপ। গান, ভ্রমণ, পারিবারিক মুহূর্ত, হাসিমুখের ছবি সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় গায়িকা দেবলীনা নন্দী ও তাঁর স্বামী প্রবাহ নন্দীর সম্পর্ক ছিল ভক্তদের কাছে ঈর্ষণীয় এক গল্প। কিন্তু সেই গল্পই অল্প সময়ের মধ্যে পরিণত হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, আইনি লড়াই এবং জনসমক্ষে সম্পর্ক ভাঙনের এক আলোচিত অধ্যায়ে।
কয়েক মাস ধরে দেবলীনা-প্রবাহের ব্যক্তিগত জীবন বারবার উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের মন্তব্য এবং আইনি পদক্ষেপ ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। তবে এই বিতর্কের কেন্দ্রে আছে এক দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পেশাগত পরিসরেও।
স্বপ্নের সংসার থেকে দূরত্ব
গায়িকা ও ইউটিউব তারকা হিসেবে দেবলীনা নন্দী দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত মুখ। বাংলা, হিন্দি ও আঞ্চলিক গানের কভার পরিবেশন করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অন্যদিকে প্রবাহ নন্দী পেশায় একজন পাইলট। বিয়ের পর তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটলের খবর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ না খুললেও ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেবলীনার কিছু পোস্ট ও ভিডিও ভক্তদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে। অনেকেই অনুমান করতে শুরু করেন, দাম্পত্য জীবনে সবকিছু স্বাভাবিক নেই।
ফেসবুক লাইভ এবং মানসিক ভেঙে পড়া
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। এক আবেগঘন ফেসবুক লাইভে দেবলীনা নিজের পারিবারিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। ভিডিওতে তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। লাইভ শেষে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা তাঁর অনুসারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। পরে জানা যায়, তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের বিনোদনজগতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও পরিবার জানায়, তিনি গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিলেন।
শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ
দেবলীনার ঘনিষ্ঠ মহল এবং তাঁর কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনই তাঁর মানসিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে নিজের মা এবং বৈবাহিক পরিবারের মধ্যে একটি বেছে নিতে চাপ অনুভব করতেন।
পরে তিনি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগও দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট হিসেবে থাকেনি; তা আইনি লড়াইয়ের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
প্রবাহের নীরবতা ভাঙা
দীর্ঘ কয়েক মাস প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি প্রবাহ নন্দী। তবে পরে তিনি সংবাদমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রবাহ দাবি করেন, দেবলীনার করা অনেক অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তিনি বলেন, কখনোই স্ত্রীকে তাঁর মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্ত দেননি।
প্রবাহের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে একপাক্ষিকভাবে দোষী প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি তিনি দাবি করেন, সম্পর্কের টানাপোড়েনের পেছনে পারিবারিক জটিলতা ও যোগাযোগের ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে।
এই বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়। দুই পক্ষের সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
আইনি প্রক্রিয়া শুরু
গত সপ্তাহেই তিক্ত দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলেছিলেন প্রবাহ। এবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিলেন দেবলীনা। গতকাল দুই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে বারুইপুর আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। একই সঙ্গে দুই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন গায়িকা।
সংবাদ সম্মেলনে দেবলীনার আইনজীবীরা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বিয়ে হয় দেবলীনা নন্দী ও প্রবাহ নন্দীর। বিয়ের পর থেকেই গায়িকার ওপর তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ডে হানিমুনে গিয়ে মদ্যপ অবস্থায় দেবলীনাকে মারাত্মক মারধর করেন প্রবাহ। আইনজীবীদের দাবি, প্রবাহ নিয়মিত মদ্যপান ও মাদক সেবন করতেন।
আইনজীবীদের আরও দাবি, এ ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন, যিনি আদালতে সাক্ষ্য দেবেন। এ ছাড়া দেবলীনার ওপর চলা নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু অডিও ও ভিডিও ক্লিপ এবং মেকআপ দিয়ে ঢাকা কালশিটে দাগের ছবিও আদালতে উপস্থাপন করা হবে।