বিশ্বজুড়ে সিনেমা প্রেমীদের কাছে তিনি একনামে পরিচিত ‘জেমস বন্ডের অভিভাবক’ হিসেবে। তবে এই রাজকীয় ও প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কেবল নিজের যোগ্যতায় বিনোদন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামের গল্প। তিনি হলিউডের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী নারী চলচ্চিত্র প্রযোজক বারবারা ব্রকোলি। জেমস বন্ডের মতো বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজির হাল ধরলেও ক্যারিয়ারের শুরুতে চারপাশের মানুষের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে নানা কটু কথা। প্রভাবশালী প্রযোজকের মেয়ে হওয়ায় অনেকেই মনে করতেন, তিনি যা পাচ্ছেন তা স্রেফ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সুযোগ, এর পেছনে তাঁর নিজস্ব কোনো মেধা নেই। তবে সস্তা পরিচয়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে না থেকে কীভাবে তিনি বাবার বিশাল সাম্রাজ্য থেকে বের হয়ে নিজের একক সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন, তা যেকোনো নারীর জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ক।
বারবারা ব্রকোলির জন্ম ১৯৬০ সালের ১৮ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের এক সিনেমাটিক পরিবারে। তিনি বন্ড চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ও মূল প্রযোজক আলবার্ট আর ব্রকোলির কন্যা। বাবার কারণে তাঁর পুরো শৈশব ও কৈশোর কেটেছে জেমস বন্ড ছবির জাদুকরী শুটিং সেটে। লন্ডনে বাবার হাত ধরে সেটে গিয়ে দেখতেন কীভাবে তৈরি হয় বন্ডের কালজয়ী সব অ্যাকশন দৃশ্য। পরবর্তীতে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন এবং কৈশোরেই বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রচারণা বা পিআর বিভাগে কাজ শুরু করেন।
তবে বাবার পরিচয়ের বাইরে নিজেকে শতভাগ প্রমাণ করার এক সুপ্ত তাগিদ সবসময় তাঁর মনে কাজ করত। কারণ, ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিনগুলোতে হলিউডের ভেতরের ও বাইরের অনেকেই ধারণা করতেন যে তিনি শুধু ‘প্রযোজকের মেয়ে’ বলেই সিনেমাতে বড় বড় পজিশন পাচ্ছেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বারবারা বলেছিলেন, ‘সবাই বলত, ও তো প্রযোজকের মেয়ে, তাই এত কিছু সহজে পেয়ে যাচ্ছে। প্রযোজক বাবার মেয়ে বলে অনেকেই মনে করত, আমার সত্যকারের কোনো মেধা বা ফিল্ম সেন্স নেই।’
চারপাশের মানুষের সেই চেনা ধারণা ও নেতিবাচকতা ভাঙতে তিনি এক লাফে শীর্ষ পদে না বসে বছরের পর বছর পর্দার আড়ালে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ সিনেমার প্রচারণা বিভাগে একদম সাধারণ কর্মী হিসেবে যুক্ত হন। পরবর্তীতে নিজের যোগ্যতাবলে সহকারী পরিচালক এবং সহযোগী প্রযোজক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি তাঁর সৎভাই মাইকেল জি উইলসনের সঙ্গে যৌথভাবে বন্ড সিরিজের প্রধান প্রযোজকের মূল দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। ওই সময় আইনি ও নানা জটিলতায় বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজি এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই ক্রান্তিকালে তাঁদের নিখুঁত পরিকল্পনায় নির্মিত ‘গোল্ডেনআই’ সিনেমার বিশ্বব্যাপী অবিস্মরণীয় সাফল্য জেমস বন্ড চরিত্রটিকে রূপালি পর্দায় এক নতুন জীবন ফিরিয়ে দেয়।
প্রযোজক হিসেবে বারবারা ব্রকোলির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত, প্রশংসিত এবং একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ড্যানিয়েল ক্রেগকে নতুন জেমস বন্ড হিসেবে কাস্টিং করা। সে সময় বন্ডের চিরাচরিত লুকের বাইরে গিয়ে এমন একজন ব্লন্ড বা স্বর্ণকেশী অভিনেতাকে বন্ড বানানোর সিদ্ধান্তে অনেক কট্টর ভক্ত ও নামী চলচ্চিত্র সমালোচকেরা তীব্র বিরোধিতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ২০০৬ সালে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে মুক্তির পর সব সমালোচনা স্তব্ধ হয়ে যায়। ড্যানিয়েল ক্রেগের সেই কাস্টিং বন্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও সফল কাস্টিং হিসেবে চিরদিনের জন্য স্বীকৃতি পায়।
তবে শুধু কাস্টিং নয়, বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির সম্পূর্ণ সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও ছিল তাঁর জন্য এক বড় যুদ্ধ। ২০২২ সালে টেক জায়ান্ট অ্যামাজন বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে ‘এমজিএম স্টুডিওস’ অধিগ্রহণ করার পর জেমস বন্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কর্পোরেট টানাটানি শুরু হয়। বারবারা ব্রকোলি সবসময় বিশ্বাস করতেন জেমস বন্ড কেবল ব্যবসার কোনো ‘কনটেন্ট’ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কয়েক বছর ধরে অ্যামাজনের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সৃজনশীল স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র মতবিরোধের পর, অবশেষে ২০২৫ সালে তিনি ও মাইকেল উইলসন বন্ডের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেন। বন্ডের চরিত্রায়ন নিয়ে হলিউডের তথাকথিত আধুনিকতা বা পরিবর্তন নিয়েও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। চরিত্র বদল প্রসঙ্গে এক জায়গায় বারবারা লিখেছিলেন, ‘জেমস বন্ড যেকোনো গায়ের রঙের বা বর্ণের হতে পারেন, কিন্তু চরিত্রটি সবসময় একজন পুরুষ হিসেবেই থাকবে। সিনেমা জগতে নারীদের জন্য জেমস বন্ডকে নারী বানানোর চেয়ে, নারীদের জন্য একদম নতুন ও শক্তিশালী মৌলিক চরিত্র সৃষ্টি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তাঁর দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে নির্মিত বন্ড সিরিজের সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘স্কাইফল’, ‘স্পেকটার’ এবং ‘নো টাইম টু ডাই’ বিশ্বজুড়ে বক্স অফিস থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে বন্ডের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক গড়ে তোলে। সিনেমার সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর ব্যক্তিগত আয়ের গ্রাফও। মার্কিন গণমাধ্যম দ্য হলিউড রিপোর্টার এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বারবারা ব্রকোলির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তাঁকে সম্মান জানিয়ে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র সাময়িকী সিনেইউরোপার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হলিউডের মূল ধারায় নারী প্রযোজকদের সংখ্যা যখন তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম ছিল, তখন বারবারা ব্রকোলি বিশ্বের সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘতম চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর একটির সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি শুধু বাবার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার রক্ষা করেননি; বরং নিজের প্রখর দূরদর্শিতা, ঝুঁকি নেওয়ার অদম্য সাহস এবং আধুনিক ভাবনার মাধ্যমে জেমস বন্ডকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।’