বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং প্রজন্ম পেরিয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উত্তম কুমার তেমনই এক নাম। পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের দর্শকের হৃদয়েও আজও অমলিন তিনি। ‘মহানায়ক’ তকমায় তাঁর তারকাখ্যাতি আরও উজ্জ্বল হলেও, সেই আবরণের আড়ালে থাকা অসাধারণ অভিনেতা উত্তম কুমারকে নতুন করে আবিষ্কারের প্রয়োজন যেন এখনো ফুরায়নি।

সেলুলয়েডের পর্দায় তাঁর এক চিলতে হাসি, সংলাপ উচ্চারণের স্বতন্ত্র ভঙ্গি কিংবা ব্যক্তিত্বের নিজস্বতা চার দশক পেরিয়েও এতটুকু ফিকে হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই এক ও অদ্বিতীয় ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারের আজ ১০০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম নেওয়া অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী সময়ে কঠোর পরিশ্রম ও অভিনয় প্রতিভায় হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা।

আজকের ‘উত্তম কুমার’ হয়ে ওঠার পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও নিরলস পরিশ্রম। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে অভিনয় জগতে নিজের জায়গা তৈরি করা মোটেও সহজ ছিল না। একের পর এক চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠিত হন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী উচ্চতায়।

বাংলা সিনেমার রোমান্টিসিজমের কথা উঠলেই পর্দায় ভেসে ওঠে উত্তম-সুচিত্রা জুটি। ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’, ‘সবার উপরে’ কিংবা ‘চাওয়া পাওয়া’র মতো একের পর এক সিনেমা দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাঁদের রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক যুগকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা।

তবে কেবল রোমান্টিক নায়কের পরিচয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি উত্তম কুমার। রূপালি পর্দায় তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য উদাহরণ। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’ থেকে শুরু করে ‘ঝিন্দের বন্দী’র মতো চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ‘নায়ক’ সিনেমায় তাঁর অভিনয়কে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও যুক্ত ছিলেন উত্তম কুমার। সংগীতচর্চাতেও ছিল তাঁর আগ্রহ ও সৃজনশীল উপস্থিতি। অর্থাৎ শুধু তারকা হিসেবে নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের সামগ্রিক শিল্পচর্চাতেও নিজের ছাপ রেখে গেছেন তিনি।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই মহানায়ক। তাঁর চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। তবু তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁর সিনেমা, অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব এখনো সমান আকর্ষণের।

জন্মশতবর্ষের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দুই বাংলার চলচ্চিত্র অঙ্গন ও অগণিত অনুরাগী গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করছে বাংলা সিনেমার রূপালি জগতের এই অবিসংবাদিত মহানায়ককে। সময় বদলেছে, বদলেছে সিনেমার ভাষা, কিন্তু উত্তম কুমারের আবেদন আজও একই রকম জীবন্ত।