তিনি আর দশটা চেনা তারকার চেয়ে একদম আলাদা। নিজের ছবির রাজকীয় প্রচারণায় তাঁকে সেভাবে পাওয়া যায় না, সংবাদমাধ্যমে ইন্টারভিউ দেন না বললেই চলে। রুপালি পর্দার বাইরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ খুব সীমিত। এই তুমুল হাইপ ও প্রযুক্তির যুগে এসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগ দিয়েছেন মাত্র বছর কয়েক আগে, সেখানেও তাঁর উপস্থিতি নামমাত্র। এমনকি সিনেমার ফার্স্ট লুক বা অফিশিয়াল স্টিল ছাড়া তাঁর সাধারণ কোনো ছবিও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নিজেকে একরকম খোলসবন্দী করে রাখা সেই মানুষটিই যখন আকস্মিক সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিলেন, তখন চমকে গিয়েছিলেন অনেকেই। রাজনীতি মানেই তো প্রতিনিয়ত জনসংযোগ, মাঠ কাঁপানো বক্তৃতা আর আমজনতার সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা মিশে যাওয়া। যিনি ক্যামেরার পেছনে এতটা অন্তর্মুখী, তিনি কি পারবেন রাজনীতির এই কঠিন ময়দান সামলাতে?

তিনি যে শুধু পেরেছেন তা-ই নয়, বরং ইতিহাস গড়ে দেখিয়েছেন। ভারতের তামিলনাড়ুর সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তিনি এখন রাজ্যটির মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আর কেউ নন, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ‘থালাপতি’ জোসেফ বিজয়। আজ ২২ জুন কালজয়ী এই অভিনেতা ও সফল রাজনীতিবিদের জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে আলো ফেলা যাক ৫০০ টাকার শিশুশিল্পী থেকে এক রাজ্যের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠার সেই রূপকথার মতো জীবন ও ক্যারিয়ারের ওপর।

সিনেমার আবহে বড় হওয়া ও ৫০০ টাকার পারিশ্রমিক বিজয়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরোটাই ছিল সিনেমার রঙিন পরিমণ্ডলে। তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন তামিলনাড়ুর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক নির্মাতা। বাবার হাত ধরেই ১৯৮৪ সালে ‘ভেটরি’ সিনেমায় মাত্র ১০ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে বিজয়ের। এক সাক্ষাৎকারে চন্দ্রশেখর জানিয়েছিলেন, সেই প্রথম ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিজয়কে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫০০ রুপি। তখন সেটের কেউ দূরতম কল্পনাতেও ভাবেনি, বাবার আঙুল ধরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো এই লাজুক ছেলেটিই একদিন পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে দামি ও প্রভাবশালী মেগাস্টার হয়ে উঠবেন। চন্দ্রশেখর আরও দাবি করেন, বহু বছর আগেই কৈশোরে তাঁর ছেলে দৃঢ় কণ্ঠে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি একদিন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হব।’

৫০০ টাকা থেকে ২২০ কোটি রুপির মহোত্থান চলতি সময়ে এসে বিজয়ের পারিশ্রমিকের অঙ্ক নিয়ে পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্র মহলেই রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজনীতিতে নামার আগে নিজের ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ ছবি হিসেবে প্রচারিত ‘জন নায়কন’-এর জন্য তিনি পারিশ্রমিক হিসেবে নিয়েছেন রেকর্ড পরিমাণ ২২০ কোটি রুপি। অর্থাৎ, ৫০০ রুপি দিয়ে শুরু করা ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে পারিশ্রমিকের এই ঐতিহাসিক বৃদ্ধি প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ শতাংশের চেয়েও বেশি। ভারতীয় সিনেমার ১০০ বছরের ইতিহাসে এমন উল্কাগতিতে উত্থান খুব কম অভিনেতার ভাগ্যেই দেখা গেছে।

অ্যাকশন হিরো থেকে সমাজ বদলের নায়ক নব্বইয়ের দশকে রোমান্টিক হিরো হিসেবে ক্যারিয়ারের ভিত গড়লেও, ২০০৪ সালের ব্লকবাস্টার অ্যাকশন ছবি ‘ঘিল্লি’ বিজয়ের ক্যারিয়ারের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়। এই ছবিটি তাঁকে তামিলনাড়ুর প্রান্তিক দর্শকদের কাছে ‘মাস হিরো’ হিসেবে একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। তবে ২০১২ সালের পর থেকে বিজয়ের সিনেমার ঘরানায় এক বড় পরিবর্তন আসে; পর্দায় তিনি আবির্ভূত হতে শুরু করেন সমাজ বদলের কান্ডারি হিসেবে। এই সময়ে ‘কাথি’ সিনেমায় কৃষকদের চরম দুর্দশা, ‘মার্সাল’-এ দেশের স্বাস্থ্য খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতি এবং ‘বিগিল’ সিনেমায় প্রান্তিক নারীদের খেলাধুলায় এগিয়ে আসার গল্প ফুটিয়ে তোলেন তিনি। এই বাণিজ্যিক ছবিগুলোর মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে রুপালি পর্দার গণ্ডি ছাড়িয়ে আপামর জনতার সামাজিক বার্তার এক জীবন্ত নায়ক হয়ে ওঠেন।

ভারতের অন্য সমসাময়িক সুপারস্টারেরা যখন বিশ্ববাজার ধরতে ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ প্যান ইন্ডিয়া ছবির পেছনে ছুটেছেন, বিজয় তখনো মূলত নিজের শিকড় তামিল সিনেমাতেই অনড় ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর জনপ্রিয়তার ঢেউ ভারতের সীমানা ছাড়িয়েছে। তাঁর ‘লিও’ সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৬০০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছিল এবং এরপর ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ (গোট) বিশ্বব্যাপী ৪০০ কোটি রুপির বেশি ব্যবসা করে। এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, থালপতির দর্শক টানার ক্ষমতা কতটা অদ্বিতীয়।

সিনেমা ছেড়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় সরাসরি রাজনীতিতে নামার অনেক আগেই তাঁর সিনেমাগুলো সেই মাঠ তৈরি করে দিয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে তাঁর প্রতিটি সিনেমার অডিও লঞ্চের রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলো আসলে একেকটি ‘সফট রাজনৈতিক ভাষণে’ রূপ নিত। তাঁর বিশাল ভক্তকুল, যারা আগে শুধু প্রেক্ষাগৃহে শিস বাজাত, তারা ধীরে ধীরে সামাজিক সেবামূলক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কর্মী বাহিনীতে সংগঠিত হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে ভারতের বিতর্কিত ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে বিজয়ের প্রকাশ্য সমালোচনা তখনই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তিনি কেবল বিনোদনের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চান। পরবর্তীতে তরুণদের বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো জনবান্ধব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে তিনি তরুণ ভোটারদের মনে জায়গা করে নেন এবং নিজের দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) নিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হন।

কেন অভিনয়কে বিদায় জানালেন বিজয়? বিজয়ের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট রাজনীতি আংশিকভাবে বা পার্ট-টাইম করা যায় না। জনগণ একজন পূর্ণসময়ের নেতাকে চায়। তামিল রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসও সেই সাক্ষ্যই দেয়। কিংবদন্তি এমজিআর কিংবা জয়ললিতা—উভয়েই ক্ষমতার শীর্ষাসনে বসার আগে অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিপরীতে যারা দুই নৌকায় পা রেখেছেন, তাদের সাফল্য এসেছে সীমিত আকারে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বিজয় অভিনয় জীবনের ইতি টানার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। মালয়েশিয়ায় তাঁর শেষ ছবি ‘জন নায়কন’-এর গান মুক্তির জমকালো অনুষ্ঠানে এই অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বিজয় বলেন, ‘বিগত ৩৩ বছর ধরে আমি প্রতিনিয়ত নানামুখী সমালোচনার শিকার হয়েছি। নেতিবাচক-ইতিবাচক সব ধরনের তিরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শুধু ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসার জোরে আমি এতগুলো বছর পার করেছি। অনুরাগীরা ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। অভিনেতা হিসেবে ৩৩ বছর কাটিয়েছি, এবার রাজনীতিবিদ হিসেবে আগামী ৩৩ বছর আমি জনগণের ঋণ শোধ করতে চাই।’

কী আছে বিদায়ী সিনেমা ‘জন নায়কন’-এ? বিজয়ের বিদায়ী সিনেমা ‘জন নায়কন’ (যার অর্থ জনগণের নেতা) এখন মুক্তির চূড়ান্ত অপেক্ষায়। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, এটিকে দেখা হচ্ছে বিজয়ের রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে। ছবিতে আছে জাঁকজমকপূর্ণ হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন, বিশ্বমানের ভিএফএক্স আর একটি তুমুল জনপ্রিয় সংলাপ ‘রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।’ এই সংলাপটি যেন সরাসরি বিজয়ের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি। যদিও মুক্তির আগে সিনেমাটি নিয়ে জটিলতা কম হয়নি; ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ডের আপত্তি, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং অনলাইনে ছবির এইচডি প্রিন্ট ফাঁস হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও থালাপতি ভক্তদের উন্মাদনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।

মুখ্যমন্ত্রীর সম্পত্তির খতিয়ান নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অফিশিয়াল হলফনামা অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০৩ কোটি রুপি। এর মধ্যে অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণই সবচেয়ে বেশি প্রায় ৪০৪ কোটি ৫৮ লাখ রুপি এবং স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৯৮ কোটি রুপির। তাঁর সম্পদের তালিকায় কোদাইকানালের বিশাল কৃষিজমি ছাড়াও চেন্নাইসহ বিভিন্ন প্রাইম লোকেশনে বাণিজ্যিক ও আবাসিক সম্পত্তি রয়েছে। নগদ অর্থ হিসেবে হাতে দুই লাখ রুপি থাকলেও বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে ২১৩ কোটি রুপিরও বেশি। এছাড়া তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিএমডব্লিউ এবং টয়োটার মতো বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ১৮৪ দশমিক ৫৩ কোটি রুপি, যার উৎস স্বনিযুক্ত পেশা, ব্যাংকের সুদ এবং সম্পত্তি থেকে আসা ভাড়া।

সংসার ভাঙনের গুঞ্জন ও আদালতের আইনি লড়াই নির্বাচনী সাফল্যের আনন্দের মাঝেই বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবন ও দীর্ঘদিনের সংসার ভাঙনের খবরটি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে বিজয়ের বিরুদ্ধে আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন তাঁর স্ত্রী সংগীতা স্বর্ণলিঙ্গম। ১৯৯৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এই দম্পতির দীর্ঘ ২৭ বছরের সাজানো সংসারে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অফিশিয়ালি ফাটল ধরে। সংগীতার দায়ের করা অভিযোগে দাবি করা হয়, ২০২১ সালে তিনি বিজয়ের একজন সহ-অভিনেত্রীর (যার ইঙ্গিত দক্ষিণি তারকা তৃষা কৃষ্ণানের দিকে) সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতে পারেন। সে সময় বিজয় সম্পর্কটি শেষ করার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে সংগীতা দেখেন যে সেই সম্পর্ক পর্দার আড়ালে এখনো চলমান। বহুল আলোচিত এই বিচ্ছেদ মামলাটির শুনানি গত ১৫ জুন চেন্নাইয়ের ফ্যামিলি কোর্টে শুরু হলেও আদালত তা নিষ্পত্তি না করে আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছেন। ফলে বিজয়ের এই ব্যক্তিগত আইনি প্রক্রিয়া আরও অন্তত দুই মাস ধরে টানটান আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।