সবাই তাঁকে একনামে চেনে বলিউডের ‘বাদশাহ’ হিসেবে। দুই হাত প্রসারিত করে করা তাঁর সেই আইকনিক পোজ রূপালি পর্দায় দেখা মাত্রই আজও লাখো ভক্তের হৃদয়ে দোলা দেয়। তবে ক্যামেরার ঝলকানি, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা আর বক্স অফিস হিটের উন্মাদনাকে একপাশে সরিয়ে রাখলে শাহরুখ খান আসলে নিতান্তই একজন ঘোর সংসারী ও আপাদমস্তক ফ্যামিলি ম্যান। তিন সন্তান আরিয়ান, সুহানা ও আব্রামের প্রতি ভীষণ দায়িত্বশীল এক বাবা। বেশ কয়েক বছর ধরেই বিনোদনপাড়ার আলোচনার টেবিল মাতাচ্ছে মেয়ে সুহানার জন্য লেখা শাহরুখের একটি ‘গোপন ডায়েরি’। কী লুকিয়ে আছে সেই ডায়েরির পাতায়? আজ বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক সেই ডায়েরি আর এক স্নেহময় পিতা শাহরুখের গল্প।

ডায়েরির শুরুটা হয়েছিল ২০১৪ সালে আজ থেকে এক যুগ আগে, অর্থাৎ ২০১৪ সালে প্রখ্যাত অভিনেতা অনুপম খেরের একটি টক শোতে অতিথি হয়ে এসে শাহরুখ প্রথম এই ডায়েরির কথা প্রকাশ্যে এনেছিলেন। তখন সুহানা ছিলেন স্রেফ এক কিশোরী। ডায়েরির প্রসঙ্গ আসতেই অনুপম খের কৌতূহলী হয়ে জানতে চান, ‘তাহলে আপনি কি মেয়ের জন্য অভিনয়ের ওপর কোনো গাইড বই লিখছেন?’ জবাবে শাহরুখ বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, এটা শুধু ওর জন্যই লেখা। আমি নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের টুকটাক অভিজ্ঞতার কথা ছোট ছোট তিন-চার লাইনে ডায়েরির পাতায় টুকে রাখছি। আমার মনে হলো ওর জন্য এটা খুব দরকার। আসলে আমার তো কাউকে বলা দরকার যে আমি কীভাবে অভিনয় করি! শুটিং সেটে আমার সহ-অভিনেতাদের এসব বলতে গেলে তারা মোটেও পাত্তা দেয় না। তাই আমি চাই, আমার মেয়ে এই বইটা পড়ুক আর ওখান থেকে অভিনয়ের খুঁটিনাটি শিখুক।’

অনুপম খের এই বইটার কোনো নাম ভেবেছেন কি না জানতে চাইলে কিং খান স্বভাবসুলভ হাসিতে জানান, ‘নাম রেখেছি—“টু সুহানা, অন অ্যাক্টিং। ফ্রম পাপা” (সুহানার জন্য, অভিনয় নিয়ে। ইতি পাপা)।’ একই অনুষ্ঠানে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি খুব চাই আমার মেয়ে বড় হয়ে অভিনয় করুক। অন্য কেউ তো আর আমার কথা শুনতে চায় না! মেয়েটা এখনো ছোট, তাই অন্তত বাবাকে সম্মান করে হলেও আমার লেখা এই বইটা হয়তো ও মন দিয়ে পড়বে। অভিনয় নিয়ে যখনই মাথায় নতুন কিছু আসে, আমি সঙ্গে সঙ্গে তা ডায়েরিতে লিখে রাখি।’

কী আছে সেই ডায়েরিতে শাহরুখ স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, এই বইটি কেবলই সুহানার জন্য তৈরি হচ্ছে। সেখানে তিনি মূলত তুলে ধরেছেন কীভাবে তিনি একটি চরিত্রকে নিজের ভেতর ধারণ করেন, কীভাবে প্রতিটি দৃশ্যের ভেতরের খাঁটি আবেগ খুঁজে পান কিংবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে নিজেকে মানসিকভাবে কীভাবে প্রস্তুত করেন। এগুলো কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং কিং খানের তিন দশকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নিংড়ে নেওয়া সংক্ষিপ্ত সব নোট। শাহরুখের কাছে বিষয়টি কেবল মেয়েকে অভিনয় শেখানো নয়; বরং একজন জাত শিল্পী হিসেবে তিনি যা কিছু শিখেছেন, সেই অমূল্য সম্পদটুকু নিজের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পরম যত্নে তুলে দেওয়া।

মেয়ের সেই ‘মঙ্গলবারের প্রেরণা’ ২০১৪ সালে প্রথম ডায়েরির কথা জানানোর ঠিক আট বছর পর, ২০২২ সালে সেই গোপন ডায়েরিটি অবশেষে আলোর মুখ দেখে। শাহরুখ ভক্তরা সুহানা খানের নিজস্ব ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলের মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারেন বাবার দেওয়া এই অমূল্য উপহারের কথা।

সুহানা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা নিয়মিত পোস্ট করেন না। তবে যখনই করেন, তা মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। সেবার নিজের ইনস্টাগ্রামে বাবা শাহরুখের কাছ থেকে পাওয়া সেই বহুল আলোচিত জার্নাল বা ডায়েরির একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন সুহানা। ডায়েরির প্রচ্ছদে কালো কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, ‘টু সুহানা, অন অ্যাক্টিং। ফ্রম পাপা’।

পরবর্তীতে আরেকবার সেই ডায়েরির ছবি পোস্ট করে সুহানা ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘মঙ্গলবারের প্রেরণা’। মেয়ের সেই পোস্টে বাবা শাহরুখের মন্তব্যটি নেটিজেনদের মন কেড়ে নিয়েছিল। রসিকতা করে শাহরুখ লিখেছিলেন, ‘অভিনয় সম্পর্কে আমি যা যা জানি না, তার সবই ওখানে লিখে রেখেছি। তুমি ওখান থেকে শিখবে, তারপর আমাকে এসে আবার নতুন করে শেখাবে।’ শাহরুখ খানের সঙ্গে সুহানার আত্মিক বন্ধন বরাবরই স্পেশাল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি মেয়েকে নিয়ে গর্বের কথা যেমন বলেছেন, তেমনই প্রয়োজনে আগলে রেখেছেন লাইমলাইটের আড়ালে। সুহানা যখন ছোট ছিলেন, তখন সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত ক্যামেরা ও মনোযোগ তাঁর একদমই ভালো লাগত না। পরবর্তীতে সুহানা নিজেও স্বীকার করেছেন, বাবার আকাশচুম্বী খ্যাতির কারণে শৈশবে পাওয়া সেই অতিরিক্ত মনোযোগ তাঁকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলত।

সন্তানদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বাবা শাহরুখ শুটিংয়ের শিডিউল যতই টাইট বা ব্যস্ত থাকুক না কেন, ছোট ছেলে আব্রামের স্কুলের কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান বা স্পোর্টস ডে শাহরুখ মিস করেন না বললেই চলে। পাঁচতারা হোটেলের জাঁকজমক ভুলে সাধারণ অভিভাবকদের মতোই তাঁকে প্রায়ই স্কুলের গ্যালারিতে অন্য দর্শকদের মাঝে বসে ছোট ছেলের জন্য গলা ফাটাতে দেখা যায়। ২০২৪ সালেও স্ত্রী গৌরী ও মেয়ে সুহানাকে নিয়ে তিনি আব্রামের স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন, যেখানে একজন গর্বিত বাবার মতো হাসিমুখে নিজের ফোনে ছেলের পারফরম্যান্সের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্র দুনিয়ায় যেখানে সব তারকারাই নিজেদের ছেলেমেয়েকে জোর করে বা অলিখিত নিয়মে ‘স্টার’ বানাতে মরিয়া, সেখানে শাহরুখের চিন্তাভাবনা একদমই ভিন্ন ও স্বাধীন। তিনি মনে করেন না যে তাঁর সন্তানদেরও তাঁর মতোই সুপারস্টার হতে হবে। এই প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো উত্তরাধিকারে বিশ্বাস করি না। আমার বাবা তো অভিনেতা ছিলেন না। আমি নিজে স্ট্রাগল করে অভিনেতা হয়েছি, তার মানে এই নয় যে আমার ছেলেমেয়েদেরও অবধারিতভাবে অভিনেতা হতে হবে।’

শাহরুখ আরও যোগ করেন, ‘তারা জীবনে কী করবে, সেটা আমি কখনই ডিক্টেট করে দেব না...আমি তাদের জন্য কী চাই, সেটা বড় কথা নয়; তারা নিজেরা জীবনে কী হতে চায়, সেটাই আসল। তারা যদি কখনো অভিনেতা নাও হয়, তাও তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমবে না।’ সন্তানদের যেকোনো ছোটখাটো সাফল্যও শাহরুখ শুধু চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখেন না, বরং পুরো পৃথিবীর সামনে বুক ফুলিয়ে উদযাপন করেন। বছরখানেক আগে সুহানা যখন লন্ডনের আরডিংলি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন, তখন শাহরুখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মেয়ের একটি মিষ্টি ভিডিও শেয়ার করে নিজের গর্ব প্রকাশ করেছিলেন। আবার বড় ছেলে আরিয়ান খান যখন পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম ওটিটি প্রজেক্টের কাজ শুরু করেন, তখন শাহরুখই সবার আগে সামাজিক মাধ্যমে সেই প্রজেক্টের ছবি শেয়ার করে ছেলের নতুন যাত্রার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

বিপুল অর্থকড়ি আর জাঁকজমকের মধ্যেও শাহরুখের মূল লক্ষ্য সন্তানদের একজন খাঁটি ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আরিয়ানকে দেওয়া একটি দারুণ শিক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে সবসময় শেখাই, কোনো মানুষকে অসম্মান করা মোটেও ঠিক নয়...আমি সবার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মানের কথা বলছি।’ তবে শুধু শাসন নয়, নিজের সন্তানদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেও কার্পণ্য করেন না কিং খান। একাধিক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ নিজেই বলেছেন, ‘আমার সন্তানেরা অত্যন্ত গোছানো ও ভদ্র...তারা আমার চেয়েও অনেক বেশি পরিপক্ব। আশ্চর্যজনকভাবে মানুষ হয়তো ভাবে, তারকার সন্তানেরা তো, বিগড়ে যাবে; কিন্তু তারা সত্যিই ভীষণ ভালো সন্তান।’

এবার বড় পর্দায় একসঙ্গে শাহরুখ-সুহানা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সুহানার আগেই অভিষেক ঘটেছে, আর বড় পর্দায় তাঁর আগমন ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে দর্শকদের মূল আগ্রহের জায়গা ছিল কবে একসঙ্গে রূপালি পর্দায় ফ্রেম শেয়ার করবেন বাস্তব জীবনের এই সুপারস্টার বাবা ও তাঁর রাজকন্যা সুহানা? সেই বহুল প্রতীক্ষিত অপেক্ষার অবসান ঘটছে চলতি বছরের শেষেই। আগামী ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের মহা-উৎসবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাচ্ছে সিদ্ধার্থ আনন্দের হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন সিনেমা ‘কিং’। এই ছবিতেই প্রথমবার রুপালি পর্দায় একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যাবে শাহরুখ ও সুহানাকে। ভেতরের খবর, বাস্তবের মতো পর্দার গল্পেও তাঁদের বাবা ও মেয়ের চরিত্রেই দেখা যাবে, যা দেখার জন্য এখন চাতক পাখির মতো প্রহর গুনছেন বিশ্বজুড়ে থাকা শাহরুখ ভক্তরা।