সাম্প্রতিক সময়ে সালমান খানের একাধিক আসন্ন প্রজেক্ট ঘিরে বলিউডে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা একদিকে যেমন তাঁর ভক্তদের স্বস্তি দিচ্ছে, তেমনই আবার কিছুটা শঙ্কাও তৈরি করছে। এই আলোচনাগুলো কি সত্যিই সালমান খানের ক্যারিয়ারে কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি আবারও প্রত্যাশার বোঝা ভেঙে পড়বে এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়।

একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই এক সময় সালমান খান ছিলেন বলিউড বক্স অফিসের একচ্ছত্র রাজা। তাঁর সিনেমা মুক্তি মানেই অন্য প্রযোজকরা মুক্তির তারিখ পিছিয়ে দিতেন। সালমানের নামেই হলে হলে উপচে পড়ত দর্শক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দাপট আজ অনেকটাই ফিকে।

‘রেস ৩’-এর পর থেকে মুক্তি পাওয়া তাঁর একাধিক সিনেমা ভক্তদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিবারই দর্শকরা আশা নিয়ে বসে থাকেন “এইবার বুঝি সালমান খান আবার পুরোনো ফর্মে ফিরবেন।” কিন্তু বাস্তবে সেই আশার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘এক থা টাইগার’ সিরিজের তৃতীয় ছবি ‘টাইগার ৩’-ও দর্শকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে সালমান খানের কিছু সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা। সালমান বরাবরই বন্ধুত্ব ও ভাইচারাকে অগ্রাধিকার দেন। এই উদার মানসিকতার কারণেই অনেক সময় তাঁর সিনেমায় এমন মানুষদের কাস্ট করা হয়েছে, যারা সেই চরিত্রের জন্য যথাযথ ছিলেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয় ঘন ঘন ক্যামিও চরিত্রে উপস্থিত হওয়া।

‘সিংঘাম এগেইন’ কিংবা চিরঞ্জীবীর ‘গডফাদার’ ছবিতে সালমান খানের ক্যামিও উপস্থিতি খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং প্রায় একই ধাঁচের উপস্থিতি বারবার হওয়ায়, তাঁর বড় পর্দায় কামব্যাকের উত্তেজনাও কিছুটা কমে গেছে।

ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো সালমান খানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন। গুঞ্জন রয়েছে, তিনি নিজের সিদ্ধান্তে খুবই অনড় থাকেন। স্ক্রিপ্টে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, আশপাশের ভুল পরামর্শ গ্রহণ, পরিচালকদের কাজে বারবার নাক গলানো এই বিষয়গুলো নাকি অনেক সময় ছবির ক্ষতি করেছে। এমনকি ক্রিয়েটিভ ডিফারেন্সের কারণে বাতিল হয়ে গেছে একাধিক সম্ভাবনাময় প্রজেক্ট, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সঞ্জয় লীলা ভানসালির ‘ইনশাআল্লাহ’।

অনেকেই মনে করেন, এই কারণগুলোই গত কয়েক বছরে সালমান খানের কাছ থেকে শক্ত কনটেন্ট না পাওয়ার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, একসময় যার সিনেমার শুধু ঘোষণাই পুরো বলিউড কাঁপিয়ে দিত, সেই সালমান খানের ‘ব্যাটল অব গালওয়ান’ ছবির ঘোষণা ঘিরেই শুরু হয় ব্যাপক ট্রল। যদিও কোনো ছবি মুক্তির আগে তার মান বিচার করা ঠিক নয়, তবুও এই প্রতিক্রিয়াই বর্তমান বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে।

তবুও সবকিছুর মাঝেও আশার আলো রয়েছে। সালমান খানের আসন্ন প্রজেক্ট নিয়ে যে গুঞ্জনগুলো শোনা যাচ্ছে, সেগুলো সত্যিই কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। শোনা যাচ্ছে, প্রশংসিত মালয়ালাম পরিচালক মাহেশ নারায়ণন, জনপ্রিয় জুটি রাজ ও ডি কে, দক্ষিণের প্রভাবশালী প্রযোজক দিল রাজু এবং শক্তিশালী প্রোডাকশন হাউস মিথ্রি মুভি মেকার্স এরা সবাই নাকি সালমান খানের সঙ্গে নিজেদের নতুন নতুন আইডিয়া শেয়ার করেছেন এবং সালমান সেই গল্পগুলোতে আগ্রহও দেখিয়েছেন।

‘টেক অফ’ ও ‘মালিক’-এর মতো প্রশংসিত থ্রিলার নির্মাতা মাহেশ নারায়ণনের সঙ্গে একটি শক্ত গল্পনির্ভর অ্যাকশন ড্রামার পরিকল্পনা চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই ছবিতে আবেগ, বাস্তবতা এবং কনটেন্ট-ড্রিভেন উপস্থাপনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ ও ‘ফারজি’-খ্যাত পরিচালক রাজ ও ডি কে-র সঙ্গে হতে পারে একটি স্টাইলিশ অ্যাকশন কমেডি, যেখানে সালমান খানকে দেখা যাবে একেবারে ভিন্ন রূপে।

‘পুষ্পা’ ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য পরিচিত মিথ্রি মুভি মেকার্স নাকি সালমান খানকে নিয়ে আনতে চাইছে একটি হাই-অকটেন প্যান-ইন্ডিয়া অ্যাকশন থ্রিলার, যা টেকনিক্যাল দিক থেকে হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। এছাড়াও, দক্ষিণের জনপ্রিয় প্রযোজক দিল রাজুর ব্যানারে তৈরি হতে পারে একটি খাঁটি অ্যাকশন-রিভেঞ্জ গল্প, যেখানে সালমান খানের ক্লাসিক অবতার ও র’ অ্যাকশন আবারও বড় পর্দায় দেখা যেতে পারে।

যদি এই গুঞ্জনগুলোর বেশিরভাগই বাস্তব রূপ নেয়, তাহলে নিঃসন্দেহে এটি সালমান খানের ক্যারিয়ারের জন্য বড় একটি ইতিবাচক দিক। কারণ দীর্ঘদিন পর তিনি তাঁর একঘেয়ে কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছেন।

এখন সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি বিষয় হলো পরিচালকদের ওপর ভরসা রাখা, শুধু অভিনয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া, নিজেকে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা এবং অবশ্যই ফিটনেসের দিকেও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া।

এই শর্তগুলো পূরণ করতে পারলেই হয়তো খুব শিগগিরই দর্শকরা সেই পুরোনো আভা নিয়ে সালমান খানকে আবার বড় পর্দায় দেখতে পাবেন। আর যদি এখানেও তাঁর পুরোনো অভ্যাসগুলো বজায় থাকে, তাহলে এই সুপারস্টারের ধামাকাদার কামব্যাকের স্বপ্ন ধীরে ধীরে আরও ফিকে হয়ে যাবে।