রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে জিন্নাত ফারজানা চাঁদনী। একসময় অভিনয়ের স্বপ্ন দেখার সাহসও ছিল না তাঁর। অথচ সেই চাঁদনীই এখন ওয়েব ফিল্ম ‘তোমাকে হলো না পাওয়া’ দিয়ে দর্শকের নজর কেড়েছেন। অভিনয়ের শুরুতে গ্রামের মেয়ের চরিত্রে মানানসই পোশাক না পেয়ে গভীর রাতে বড় বোনের সাহায্যে কাজিনের পোশাক চুরি করে শুটিংয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে তাঁর জীবনে। আর অভিনয়ের পথে এই তরুণীর অন্যতম প্রেরণা অভিনেতা মোশাররফ করিম।
পরিবারের অমতেই অভিনয়ে আসা
স্কুল-কলেজে আবৃত্তি করতেন চাঁদনী। পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু অভিনয়ের কথা ভাবার সাহস ছিল না। কারণ, তাঁর পরিবার ছিল রক্ষণশীল। স্কুলের বার্ষিক ডিসপ্লেতে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও পরিবারকে জানাতে ভয় পেতেন তিনি।
ইডেন কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠান, সিনিয়রদের সঙ্গে মেলামেশা আর টিএসসিতে ছবি তোলা থেকেই অভিনয়ের পথে যাত্রা শুরু হয় তাঁর। এক সিনিয়র আপু চাঁদনীর ছবি দেখে তাঁকে মডেলের মতো দেখতে বলে প্রশংসা করেন। পরে সেই আপুই তাঁর ছবি এক পরিচালকের কাছে পৌঁছে দেন। সেখান থেকেই অভিনয়ের সুযোগ।
২০২৩ সালে শামস করিমের ‘খোঁচা’ নাটকের মাধ্যমে পর্দায় অভিষেক হয় চাঁদনীর। নাটকটিতে প্রধান চরিত্রে ছিলেন মোশাররফ করিম ও নিশাত প্রিয়ম। শুরুতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে বড় পরিসরের কাজের সুযোগ পান তিনি। ‘রঙিলা পুতুল’, ‘শাদি মোবারক’ ও ‘বিশ্বাস বনাম সরদার’-এর মতো ধারাবাহিকেও অভিনয় করেছেন এই অভিনেত্রী।
কাজিনের পোশাক চুরি করে শুটিং
অভিনয়জীবনের শুরুর দিকের একটি মজার ঘটনা আজও মনে আছে চাঁদনীর। ঈদের নাটক ‘বউ বিভ্রাট’-এ গ্রামের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল তাঁকে। ঢাকায় বেড়ে ওঠা চাঁদনীর কাছে চরিত্রের উপযোগী পোশাক ছিল না। পরিচালকও জানিয়ে দিয়েছিলেন, পোশাকের ব্যবস্থা তাঁকেই করতে হবে।
বাড়িতে চাচাতো বোনের কাছে উপযুক্ত পোশাক থাকলেও শুটিংয়ের কথা বললে তা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তাই বড় বোনের সঙ্গে মিলে গভীর রাতে কাজিনের পোশাক নিয়ে শুটিংয়ে যান চাঁদনী। পরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে টিভিতে নাটকটি দেখার সময় আড়চোখে কাজিনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলেন তিনি। তবে মোশাররফ করিমের সঙ্গে তাঁর দৃশ্য দেখে কাজিন আর কিছু বলেননি। বরং ঘটনাটি নিয়ে সবাই মিলে হাসাহাসি করেছেন।
‘মোশাররফ করিম জীবন্ত বই’
চাঁদনীর অভিনয়জীবনে মোশাররফ করিমের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম নাটকে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন চাঁদনী। বিষয়টি বুঝতে পেরে মোশাররফ করিম গল্প করে, কখনো ধমক দিয়ে তাঁকে স্বাভাবিক করে তোলেন।
এই অভিনেতার কাছ থেকে অভিনয়ের পাশাপাশি জীবনের নানা বিষয়েও শিখেছেন চাঁদনী। তাঁর ভাষায়, মোশাররফ করিম একজন অসাধারণ অভিনেতা, মানুষ ও মেন্টর। তাই তাঁকে ‘জীবন্ত বই’ মনে করেন তিনি। চঞ্চল চৌধুরীসহ পরিচিত অনেক অভিনয়শিল্পীর সঙ্গেও কাজ করেছেন চাঁদনী।
পরিবারের আপত্তি কাটিয়ে অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার পেছনেও এই তারকাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ভূমিকা রেখেছে। চাঁদনীর ভাষ্য, তাঁর মা-বাবাসহ পরিবারের সবারই পছন্দের তারকা মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার পর পরিবারের কাছে অভিনয়ের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
‘তোমাকে হলো না পাওয়া’ দিয়ে নতুন পরিচিতি
চাঁদনীর প্রথম ওয়েব ফিল্ম ‘তোমাকে হলো না পাওয়া’। এতে প্রীতি নামের এক প্রাণবন্ত কলেজছাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বাবার সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে থাকা প্রীতির জীবন বদলে যায় আবির নামের এক ভয়ংকর স্থানীয় গ্যাংস্টারের নজরে আসার পর। ওয়েব ফিল্মটিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন জোনায়েদ বোগদাদী।
এই কাজের মাধ্যমে পরিবার, সহকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পাচ্ছেন চাঁদনী। তাঁর মতে, ওয়েব ফিল্মের বড় পরিসর, গল্প ও চরিত্রের সমন্বয় কাজটিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তিন বছরের অভিনয়জীবনে নিজের দক্ষতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে শিখেছেন চাঁদনী। শুরুতে মনে হতো, অভিনয় ভালোই পারেন। কিন্তু এখন নতুন ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্র পেলেই মনে হয়, শেখার আরও অনেক কিছু বাকি।
সামনে একাধিক একক নাটক ও ওটিটির প্রকল্পে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। অভিনয়ে আরও উন্নতি করতে চান এই তরুণ অভিনেত্রী। পাশাপাশি তাঁর আরেকটি স্বপ্ন, একদিন কোনো তরুণ অভিনয়শিল্পীও যেন তাঁকে নিজের প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন, যেমনটা তিনি আজ বলেন মোশাররফ করিমের কথা।