বাংলাদেশের অভিনয়াঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ডলি জহুর। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র তিন ক্ষেত্রেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের এক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তার অভিনয়জীবনের সূচনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে, ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তার অভিনয় প্রতিভা সবার নজরে আসে। এরপর নাট্যব্যক্তিত্ব ম. হামিদের হাত ধরে তিনি যুক্ত হন ‘নাট্যচক্র’ থিয়েটারের সঙ্গে। সেখানে ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

পরবর্তীতে বন্ধু ও পরবর্তী সময়ে জীবনসঙ্গী জহুরুল ইসলামের সঙ্গে ‘কথক নাট্যগোষ্ঠী’তে যোগ দেন ডলি জহুর। এই দলের হয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প ‘প্রাগৈতিহাসিক’ অবলম্বনে নির্মিত নাটকে অভিনয় করেন তিনি। মঞ্চে তার সক্রিয়তা আরও বাড়ে যখন মামুনুর রশীদের ‘বাংলা থিয়েটার’-এর ‘মানুষ’ নাটকে অভিনয় করে দেশ-বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেন। বিদেশ সফরের এক পর্যায়ে ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের একটি প্রযোজনায় জরুরি পরিস্থিতিতে মঞ্চে ওঠার সুযোগ পান তিনি। দেশে ফেরার পর ‘ময়ূর সিংহাসন’ নাটকে ‘প্রিন্সেস বলাকা’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আরণ্যকের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের সূচনা হয়।

মঞ্চে সাফল্যের পর ছোট পর্দায়ও সমান দক্ষতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ডলি জহুর। ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’-তে ‘নিলু ভাবী’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত এই নাটক তাকে ঘরে ঘরে পরিচিত মুখে পরিণত করে। পরে হুমায়ূন আহমেদের ‘জননী’ নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেন তিনি।

টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন ডলি জহুর। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘অসাধারণ’। এরপর তিনি ১৬০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৯২ সালে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রে ‘রাবেয়া’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া ‘আগুনের পরশমণি’সহ একাধিক প্রশংসিত চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

২০০৬ সালে কাজী মোরশেদ পরিচালিত ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে ‘রোকেয়া’ চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন ডলি জহুর। দীর্ঘ ও গৌরবময় অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ‘আজীবন সম্মাননা’ অর্জন করেন।

অভিনয়ের প্রতি তার নিবেদন কেবল চলচ্চিত্র ও নাটকে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নির্মিত বিশেষ টেলিফিল্ম ‘শেষের রাত্রি’তেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের মাধ্যমে ডলি জহুর প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম থাকলে একজন শিল্পী সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকতে পারেন।