বিশ্ব চলচ্চিত্রের নন্দিত নির্মাতা বেলা তার আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভোগার পর মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি হাঙ্গেরিয়ান পরিচালক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

হাঙ্গেরিয়ান ফিল্ম আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাঁর চলে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। সেখানে বলা হয়, “দীর্ঘ কঠিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষে বেলা তার আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।শোকাহত পরিবার এই সংবেদনশীল সময়ে গণমাধ্যম ভক্তদের প্রতি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানিয়েছে।

সাতানতাঙ্গোএবংদ্য তুরিন হর্সএর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের নির্মাতা বেলা তার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির দক্ষিণাঞ্চলের শহর পেচে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবার উপহার দেওয়া একটি সাধারণ ক্যামেরা দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি তাঁর আগ্রহের সূচনা। পরবর্তী সময়ে তিনি যোগ দেন হাঙ্গেরির বিখ্যাত নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান বেলা বালাজ স্টুডিওতে, যা তাঁর সৃজনশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৭৭ সালে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রফ্যামিলি নেস্টদিয়েই তিনি আলোচনায় আসেন। সামাজিক বাস্তবতার কঠোর উপস্থাপন এবং দীর্ঘ শটনির্ভর ভিন্নধর্মী নির্মাণভঙ্গি তাঁকে দ্রুতই আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৮৮ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিতড্যামনেশনতাঁর ক্যারিয়ারের আরেক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ছবিটি হাঙ্গেরির প্রথম স্বাধীন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তিনি লিখেছিলেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে, যাঁর সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল অংশীদারিত্ব আজীবন অব্যাহত ছিল।

বিশ্বব্যাপী বেলা তারের সবচেয়ে আলোচিত কাজ ঘণ্টা দীর্ঘ মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রসাতানতাঙ্গো পূর্ব ইউরোপে কমিউনিজমের পতন-পরবর্তী সমাজের অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানুষের হতাশাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমা বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। ধীরগতির বয়ান, গভীর দর্শন এবং মানবমনের জটিলতার নান্দনিক প্রকাশ তাঁকে আধুনিক সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতায় পরিণত করে।

২০১১ সালেদ্য তুরিন হর্সমুক্তির পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। তবে অবসর গ্রহণের পরও দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি, যা তাঁর অমলিন সৃজনশীলতার প্রমাণ বহন করে।

নির্মাণজীবনের শেষ অধ্যায়ে নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের প্রশিক্ষণ দিকনির্দেশনায় নিজেকে উৎসর্গ করেন বেলা তার। হাঙ্গেরি, জার্মানি এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে তিনি তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতা, নির্মাণদর্শন শিল্পবোধ।

চলচ্চিত্রবোদ্ধারা মনে করছেন, বেলা তারের প্রয়াণ বিশ্ব সিনেমার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর চলচ্চিত্র যেমন দর্শকদের ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করেছে, তেমনি অনুপ্রাণিত করেছে অসংখ্য নির্মাতাকে। অনন্য নির্মাণভাষার এই শিল্পীর সৃষ্টি ভবিষ্যতেও বিশ্ব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।