বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি এটিএম শামসুজ্জামান
বাংলা চলচ্চিত্রে এমন অনেক অভিনেতা রয়েছেন, যাদের অভিনীত চরিত্র পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। এটিএম শামসুজ্জামান ছিলেন তেমনই এক কিংবদন্তি। খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা কিংবা গম্ভীর চরিত্র যে ভূমিকাতেই অভিনয় করেছেন, নিজস্ব অভিনয়শৈলীতে সেটিকে করে তুলেছেন স্মরণীয়।
আজ কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান নামে। ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তবে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের শিল্পীজীবনে তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র।
ক্যামেরার পেছন থেকেই শুরু
অভিনয়ে আসার আগে চলচ্চিত্রের নেপথ্যে কাজ করতেন এটিএম শামসুজ্জামান। ১৯৬১ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখাতেও নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ‘জলছবি’ সিনেমার কাহিনি ও চিত্রনাট্য লেখার মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। পরে শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই শিল্পী।
‘এতটুকু আশা’ থেকে অভিনয়ের যাত্রা
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে অভিনয়ে পা রাখেন এটিএম শামসুজ্জামান। ১৯৬৮ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘এতটুকু আশা’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার পর্দায় হাজির হন তিনি। শুরুতে কৌতুক চরিত্রে অভিনয় করলেও খুব দ্রুতই নিজেকে নানা ধরনের চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেন। খলনায়ক, কমেডি কিংবা গম্ভীর প্রতিটি ভূমিকাতেই ছিল তার স্বতন্ত্র অভিনয়ের ছাপ।
‘রামের সুমতি’, ‘যাদুর বাঁশি’, ‘ম্যাডাম ফুলি’ ও ‘চুড়িওয়ালা’র মতো সিনেমায় তার কৌতুক অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। অন্যদিকে ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ও ‘গেরিলা’র মতো সিনেমায় তার অভিনয় পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন এটিএম শামসুজ্জামান। ‘দায়ী কে?’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ ও ‘চোরাবালি’র জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। ২০১৫ সালে লাভ করেন একুশে পদক।
অভিনয়ের পাশাপাশি গল্প, চিত্রনাট্য লেখা এবং পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ‘এবাদত’ সিনেমা পরিচালনার মাধ্যমে নির্মাতা হিসেবেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন এই গুণী শিল্পী।
২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন এটিএম শামসুজ্জামান। শারীরিকভাবে তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার অভিনীত অসংখ্য চরিত্র এখনো দর্শকের মনে জীবন্ত। ক্যামেরার পেছনে সহকারী পরিচালক হিসেবে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেতা।