বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়ের অন্যতম কাণ্ডারি, চিরসবুজ নায়ক আলমগীর আজ পা রাখলেন ৭৬ বছরে। ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম প্রযোজক কলিম উদ্দিন আহম্মেদ ওরফে দুদু মিয়ার সন্তান আলমগীর বাবার দেখানো পথেই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন, তবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে। অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা কিংবা গান সব মাধ্যমেই তিনি কুড়িয়েছেন আকাশচুম্বী সাফল্য। তবে কয়েক বছর ধরে নিজের এই বিশেষ দিনটি কোনো আড়ম্বর ছাড়াই পরিবারের সঙ্গে নিভৃতে কাটাতে পছন্দ করেন তিনি। আজও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

পারিবারিক স্বস্তি ও ফেলে আসা জন্মদিন এক সময় আলমগীরের জন্মদিন মানেই ছিল চলচ্চিত্রের মানুষদের মিলনমেলা। তবে করোনা মহামারির পর থেকে তিনি উদযাপনের পরিধি গুটিয়ে নিয়েছেন। এখন অফিস আর বাড়ি, এই বৃত্তেই তাঁর দিন কাটে। অভিনেতা নিজেই জানান, জাঁকজমক নয়, বরং চলচ্চিত্রের মানুষদের সঙ্গে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়াই ছিল তাঁর পছন্দের। তবে বর্তমানের শান্ত ও পরিবারকেন্দ্রিক জীবনই তাঁকে বেশি স্বস্তি দেয়।

চলচ্চিত্রের সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ জন্মদিনে স্মৃতিকাতর হলেও দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে আলমগীরের কণ্ঠে ঝরল হতাশা। ১,৪০০ প্রেক্ষাগৃহ থেকে সংখ্যাটি ১০০-র নিচে নেমে আসাকে তিনি শিল্পের ‘ট্র্যাক হারানো’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, অশ্লীলতা আর দুর্বল নির্মাণ দর্শকদের হল থেকে বিমুখ করেছে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রশ্ন, “ভালো চিত্রনাট্যকার, পরিচালক বা সুরকার ছাড়া আমি নতুন শিল্পী গড়ব কী দিয়ে?” তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্রের এই দীর্ঘ ‘রাত্রি’ কাটাতে হলে সবাইকে একসঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে।

অভিনয়ে ফেরার শর্ত ও ব্যক্তিগত অপূর্ণতা ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতা সাফ জানিয়ে দিলেন, অভিনয় থেকে তিনি অবসর নেননি। তবে প্রথাগত বড়লোক-গরিবের প্রেম নয়, পৃথিবী এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও শক্তিশালী গল্পের অপেক্ষায় আছেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, এত প্রাপ্তির মাঝেও বরেণ্য এই অভিনেতার একটি বড় অতৃপ্তি রয়ে গেছে। আলমগীর বলেন, “আমার ভেতরের কথা হলো, আমি আজও একজন ভালো অভিনেতা হতে পারলাম না।” এই বিনয়ী স্বীকারোক্তিই যেন প্রমাণ করে তাঁর শিল্প-সাধনার গভীরতা।

সন্তানদের নিয়ে গর্বিত বাবা ব্যক্তিজীবনে আলমগীর একজন সার্থক পিতা। বড় মেয়ে আঁখি আলমগীরকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চাইলেও তিনি আজ দেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী। বাবার অপূর্ণ সংগীত-স্বপ্ন যেন মেয়ের কণ্ঠেই পূর্ণতা পেয়েছে। ছোট মেয়ে তুলতুল এবং ছেলের ক্যারিয়ার নিয়েও তিনি এখন তৃপ্ত। জীবনের এই প্রান্তে এসে ভোরের সূর্যের অপেক্ষায় থাকা এই কিংবদন্তি মনে করেন, সুন্দর নীতিমালা আর সঠিক নেতৃত্বই পারে ঢাকাই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দিতে।