মুম্বাইয়ের একটি গ্যারেজে একটি অ্যাপল কম্পিউটার আর তিন শিক্ষকের সহযোগিতায় শুরু হয়েছিল তাঁর স্বপ্নের যাত্রা। কয়েক দশকের সেই পথচলায় গড়ে তুলেছেন আন্তর্জাতিক ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডিএনইজি, যা একাধিক অস্কার জিতেছে। এবার ভারতীয় মহাকাব্য ‘রামায়ণ’কে বিশ্বদর্শকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরার বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন প্রযোজক নমিত মালহোত্রা।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন নমিত, সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে। ভিডিও সম্পাদনা ও কম্পিউটার গ্রাফিকসের ছোট ব্যবসা থেকে প্রাইম ফোকাস, এরপর ডিএনইজি প্রতিটি ধাপেই ছিল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, ঝুঁকি নেওয়া এবং নতুন সম্ভাবনা খোঁজার গল্প।
এখন তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির দুই পর্বের সিনেমা ‘রামায়ণ’। রণবীর কাপুর, যশ, সাই পল্লবী ও সানি দেওলের মতো তারকাদের নিয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু বড় বাজেটের সিনেমা তৈরি নয়; ভারতীয় পুরাণের গল্পকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পরিসরে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করা।
গ্যারেজ থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে
চলচ্চিত্রের সঙ্গে নমিত মালহোত্রার পরিচয় পারিবারিক সূত্রেই। তাঁর বাবা নরেশ মালহোত্রা চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং দাদা এম এন মালহোত্রা ছিলেন চিত্রগ্রাহক। ফলে ছোটবেলা থেকেই সিনেমা নির্মাণের বিভিন্ন দিক কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তবে প্রচলিত পথে প্রযোজক হওয়ার বদলে চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত দিকেই নিজের পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালে ভিডিও ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর উদ্যোক্তা জীবন। কম্পিউটার গ্রাফিকস ও ভিডিও সম্পাদনার কাজ দিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রের পোস্ট-প্রোডাকশনেও যুক্ত হয়। পরে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ভিডিও ওয়ার্কসের সঙ্গে ব্যবসা একীভূত করে ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন প্রাইম ফোকাস।
ভারতের বিনোদনশিল্পে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকায় নমিতও ব্যবসার পরিসর বিস্তারের সুযোগ দেখেন। সম্পাদনা ও গ্রাফিকসের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে প্রাইম ফোকাস ভারতের অন্যতম বড় স্বাধীন মিডিয়া সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
বড় ঝুঁকি, আর্থিক ক্ষতি এবং ঘুরে দাঁড়ানো
নমিতের সাফল্যের পেছনে রয়েছে বড় ঝুঁকি নেওয়ার ইতিহাস। উন্নত পোস্ট-প্রোডাকশন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে তিনি বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। সে সময় পরিবারের সম্পত্তিও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকায় ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন তিনি। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডাবল নেগেটিভের সঙ্গে প্রাইম ফোকাসের একীভূতকরণ তাঁর ব্যবসায়িক যাত্রায় বড় মোড় নিয়ে আসে। এর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ডিএনইজি।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ ছিল না। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন নমিত। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ব্যক্তিগত সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছিলেন তিনি। সেই ধাক্কা সামলে আবার ব্যবসা বিস্তারে মনোযোগ দেন।
মুম্বাইয়ের গ্যারেজে শুরু হওয়া ছোট উদ্যোগ এভাবেই বিভিন্ন মহাদেশে কার্যক্রম বিস্তৃত করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
হলিউডে ডিএনইজির পরিচিতি
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে জটিল দৃশ্য নির্মাণ ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের কাজে ডিএনইজি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘এক্স মাকিনা’, ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ ও ‘ফার্স্ট ম্যান’-এর মতো সিনেমায় কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মহাকাশ, ভবিষ্যতের নগর কিংবা বাস্তবে ধারণ করা কঠিন দৃশ্যকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা ডিএনইজিকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে পরিচিত করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির অর্জনের তালিকায় আটটি একাডেমি পুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নমিতের কাছে এসব অর্জন কেবল ব্যবসায়িক সাফল্য নয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করা এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড তৈরির সুযোগও তাঁর দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন ‘রামায়ণ’ নমিতের সবচেয়ে বড় বাজি?
ডিএনইজিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার নমিতের মনোযোগ ভারতীয় মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এ। দুই পর্বের এই সিনেমা পরিচালনা করছেন ‘দঙ্গল’ ও ‘ছিছোরে’খ্যাত নীতেশ তিওয়ারি।
সিনেমাটিতে রামের চরিত্রে রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী, রাবণের চরিত্রে যশ, হনুমানের চরিত্রে সানি দেওল এবং লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবেকে দেখা যাবে।
প্রকল্পটির বাজেট নিয়েও রয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুই পর্ব মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির কাছাকাছি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনভেদে বাজেটের হিসাব আলাদা। কোথাও শুধু নির্মাণব্যয়, আবার কোথাও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, সংগীত, প্রযুক্তি ও বিপণনসহ অন্যান্য খরচও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত ব্যয় নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নমিত জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার পর তিনি নিজেকে এই মাত্রার একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রস্তুত মনে করছেন। তাঁর লক্ষ্য, বাজেট ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার অজুহাত না দিয়ে ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বের বড় প্রযোজনাগুলোর সঙ্গে একই কাতারে নিয়ে আসা।
এ আর রাহমান ও হ্যান্স জিমারের সহযোগিতা
‘রামায়ণ’-এর অন্যতম আলোচিত দিক হলো ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পের অভিজ্ঞ শিল্পীদের একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ। সিনেমাটির সংগীত পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন অস্কারজয়ী এ আর রাহমান ও হ্যান্স জিমার।
এ ছাড়া অ্যাকশন দৃশ্য নির্মাণে কাজ করছেন টেরি নোটারি ও গাই নরিস। প্রাচীন ভারতের নগর, প্রাসাদ ও বিস্তৃত ভূদৃশ্য পর্দায় তুলে ধরতে যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক প্রোডাকশন ডিজাইনারদের একটি দল। সিনেমাটি আইম্যাক্সে মুক্তির উপযোগী করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের দায়িত্বে রয়েছে ডিএনইজি ও রিডিফাইন।
নমিতের পরিকল্পনায় এই প্রযুক্তিগত আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু দৃশ্যের জাঁকজমক বাড়ানো নয়। বরং গল্পের আবেগ, চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে ভারতীয় দর্শকের পাশাপাশি ভিন্ন সংস্কৃতির দর্শকেরাও এর সঙ্গে সংযোগ অনুভব করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসে নমিতের ‘অস্কার মুহূর্ত’
২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে একাডেমি মিউজিয়াম অব মোশন পিকচার্সের ডেভিড গেফেন থিয়েটারে ‘রামায়ণ’-এর বিশেষ উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবন ও স্বপ্নের প্রকল্প নিয়ে কথা বলেন নমিত মালহোত্রা।
১৯ বছর বয়সে একটি অ্যাপল কম্পিউটার নিয়ে কাজ শুরু করার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন তিনি। সেই সময় পাশে ছিলেন তিন শিক্ষক মার্জিন, প্রকাশ ও জোসেফা। তাঁদের সহযোগিতায় শুরু হওয়া উদ্যোগ যে একদিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের বড় প্রকল্পে যুক্ত হবে, তা ছিল তাঁর স্বপ্নেরই অংশ।
অনুষ্ঠানে মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান, সহকর্মী ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নমিত। ডিএনইজির পুরস্কারজয়ী যাত্রা এবং ক্রিস্টোফার নোলান ও ডেনিস ভিলনভের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার পর এবার নিজের প্রযোজনায় ভারতীয় মহাকাব্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন তিনি। এ কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেসের আয়োজনটিকে নিজের ‘অস্কার মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এই প্রযোজক।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
নমিত মালহোত্রার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণামূলক হলেও ‘রামায়ণ’ প্রকল্পটি তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা। বিপুল বাজেট, তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত দল থাকলেই যে সিনেমা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
ভারতে ‘রামায়ণ’-এর একাধিক টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র সংস্করণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাই নতুন সংস্করণটির সামনে রয়েছে পরিচিত কাহিনিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ, পাশাপাশি পুরোনো সংস্করণের সঙ্গে তুলনার চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বাজারেও এমন দর্শকদের আকৃষ্ট করতে হবে, যাঁদের অনেকের কাছে এই মহাকাব্য নতুন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেমাটির প্রথম পর্বের মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর। দ্বিতীয় পর্ব মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে ২০২৭ সালে দীপাবলির সময়।
মুম্বাইয়ের গ্যারেজে শুরু হওয়া একটি ছোট উদ্যোগ থেকে অস্কারজয়ী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নমিতের যাত্রা ইতিমধ্যে তাঁকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে পরিচিত করেছে। এবার ‘রামায়ণ’ দিয়ে তাঁর লক্ষ্য আরও বড়: ভারতীয় মহাকাব্যের গল্পকে বিশ্বদর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই স্বপ্ন কতটা সফল হবে, তার উত্তর দেবে সিনেমাটির চূড়ান্ত নির্মাণ ও দর্শকপ্রতিক্রিয়া।